কর্মবিরতির নামে সারা দেশে পরিবহণ শ্রমিকদের নৈরাজ্য

প্রকাশিত: ৬:২৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০১৮

কর্মবিরতির নামে সারা দেশে পরিবহণ শ্রমিকদের নৈরাজ্য

সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এর কয়েকটি ধারা সংশোধনসহ ৮ দফা দাবি আদায়ে রোববার সকাল ৬টা থেকে ৪৮ ঘন্টার কর্মবিরতি শুরু করেছেন পরিবহন শ্রমিকরা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে ডাকা এই কর্মবিরতির নামে কার্যত: দেশজুড়ে নৈরাজ্য শুরু করেছেন পরিবহন শ্রমিকরা। শ্রমিকদের বাধার মুখে রোববার যানবাহন চলাচল না করায় পথচারীরা পড়েন চরম বিপাকে। দেশের অনেকস্থানে শ্রমিকদের হাতে নাজেহাল হন অনেক প্রাইভেট কার ও অটো রিকসার চালক ও যাত্রীরা। রাজধানীর পথ-ঘাট ছিলো পরিবহনশূন্য। রাজপথ দাপিয়ে বেড়িয়েছে রিকশা। মানুষ কয়েকগুন বেশী ভাড়া দিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে গেছেন। আবার অনেককে হেটে গন্তব্যে পৌছতে দেখা গেছে।

রোববার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিবহন শ্রমিকরা রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে যান চলাচলে বাঁধা দেন। গণপরিবহনের সাথে সাথে প্রাইভেট গাড়ী চলাচলেও তারা বাধা দেন। যারা গতকাল রাস্তায় গাড়ী নিয়ে নেমেছেন তাদের অনেকেই নাজেহাল এমনকি মারধরের শিকার হয়েছেন। পোড়া মবিল মেখে দেখা হয়েছে চালক ও যাত্রীদের মুখে। জারা গেছে, মৌলভীবজার জেলার বড়লেখা উপজেলায় পরিবহন শ্রমিকরা একটি এ্যাম্বুলেন্স আটকে দিলে সেটিতে থাকা আজমির গ্রামের কুনি মিয়ার ৭ দিনের নবজাতক মারা যায়। এছাড়া একই উপজেলার কালনী ব্রীজ এলাকায় শ্রমিকরা বরযাত্রীবাহী একটি বাস আটকে দিলে সেখানে দু’পক্ষের সংঘর্ষে ৮ জন আহত হন। দেশের বিভিন্নস্থানে এসব ঘটনা পুলিশের চোখের সামনে ঘটলেও তারা ছিলো নির্বিকার।

গত ২৯ জুলাই দুপুরে ছুটির পরে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনের বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র আবদুল করিম ওরফে সজীব এবং একই কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী দিয়া খানম ওরফে মিম নিহত হন। তারা রাস্তার পাশের ফুটপাথে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস তাদের চাপা দিলে দু’জন নিহত হন। এ সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন।

এ ঘটনার পর রাস্তায় মানুষ পিষে মারার প্রতিবাদে এবং সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে জুলাই মাসের শেষ দিকে ৯ দফা দাবিতে রাস্তায় নামেন শিক্ষার্থীরা। তারা শ্রমিক নেতা ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগও দাবি করেন। আগষ্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ জুড়ে এ আন্দোলন চলে। তখন উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো দেশ। এরপর সরকারের পক্ষ থেকে সড়ক নিরাপত্তা আইন পাশ করা হয়। আইনটি পাশের পরই তা প্রতিরোধে দেশজুড়ে মালিক-শ্রমিকদের মাঝে গণসংযোগ শুরু করেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা। এরপরই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে ২৮ ও ২৯ অক্টোবর দেশজুড়ে কর্মবিরতি পালনের ডাক দেয়া হয়।

রোববার এই কর্মবিরতির প্রথম দিনে কোথাও কোথাও পরিবহন শ্রমিকরা গাড়ী চালকদের কর্মবিরতি পালনে বাধ্য করেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। কর্মবিরতির কারণে কোন এলাকায় গণ পরিবহন চলাচল করতে দেখা যায়নি। বিশেষ করে বাস এবং পণ্যবাহী কোন গাড়ী চলাচল করেনি। ফলে মানুষ চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েন।

রাস্তার মোড়ে মোড়ে শ্রমিকদের মহড়া
রাজধানীর টার্মিনালগুলো ও এর আশপাশের এলাকাসহ রাস্তার মোড়ে মোড়ে গতকাল পরিবহন শ্রমিকদের মহড়া দিতে দেখা যায়। বেলা ১২ টার দিকে যাত্রাবাড়ি ও সায়েদাবাদ এলাকায় দেখা যায় বিপুল সংখ্যক শ্রমিক রাস্তায় অবস্থান করছেন। তারা যানবাহন চলাচলে বাধা দেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, শ্রমিকরা সকাল থেকে কোন গাড়ী টার্মিনাল থেকে বের হতে দেননি। সায়েদাবাদ টার্মিনালের এক গাড়ী মালিক বলেন, সকালে তারা যাত্রী তুলেছিলেন। কিন্তু গাড়ী টার্মিনালের বাইরে যেতে পারেনি।

গাবতলী টার্মিনাল থেকে আমিনবাজার ব্রীজ পর্যন্ত মহড়া দেন শ্রমিকরা। তাদের হাতে ছিলো লাঠি। টার্মিনাল থেকে কোন গাড়ী তারা রাস্তায় বের হতে দেননি। গুলিস্তান টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায় বিপুল সংখ্যক শ্রমিক রাস্তায় মহড়া দিচ্ছেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, সকালে অনেকে গাড়ী নিয়ে রাস্তায় বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাদেরকে বাধা দেন শ্রমিকরা। একই পরিস্থিতি দেখা গেছে মহাখালী বাস টার্মিনালে। তেজগাঁও ও মোহাম্মদপুর ট্রাক স্ট্যান্ডে আগের রাতেই মহড়া দেন শ্রমিকরা যাতে কোন ট্রাক টার্মিনাল থেকে বের হতে না পারে।

রেহাই মেলেনি শিক্ষার্থী, প্রাইভেট কার এবং রোগীবাহী এ্যাম্বুলেন্সেরও
কোন কোন এলাকায় পরিবহন শ্রমিকরা ব্যাপক তান্ডব চালিয়েছেন। তাদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন সাধারণ পথচারী, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, প্রাইভেট গাড়ীর চালকরা। এমনকি এ্যাম্বুলেন্সের রোগী ও চালকরাও তাদের হাত থেকে রেহাই পাননি। ছাত্রীদেরকেও নাজেহাল করেছেন তারা।

নারায়ণগঞ্জে সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রীদের বহন করা বাসে হামলা চালিয়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা। এসময় তারা বাসচালক ও ছাত্রীদের গায়ে পোড়া মবিল মেখে দেন। গতকাল দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের সাইনবোর্ড এলাকায় একটি-পেট্রোলপাম্পের কাছে এ ঘটনা ঘটান শ্রমিকরা। বাসটি সেখানেই আটকে রাখেন শ্রমিকরা। শিক্ষার্থীরা জানান, দুপুর ১২টার দিকে সাইনবোর্ড এলাকা পার হওয়ার সময় হঠাৎ শ্রমিকরা বাসটি থামিয়ে চালককে মারধর করেন ও তার মুখে শরীরে পোড়া মবিল মেখে দেন। এর প্রতিবাদ করলে কয়েকজন ছাত্রীকেও পোড়া মবিল মেখে দেন শ্রমিকরা। তারা ছাত্রীদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন ও গাড়ীর গ্লাস ভেঙ্গে ফেলেন। বাসটির চালক মজিবর জানিয়েছেন, বাসটিতে ৩৮ জন ছাত্রী ছিলেন। তারা সবাই নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজে অধ্যয়নরত। বাসটি সাইনবোর্ড এলাকায় এলেই হামলা করে বাসের গ্লাস ভাঙচুর করেন শ্রমিকরা। পরে ছাত্রীদের গায়েও পোড়া মবিল মাখিয়ে দেন।

নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ বেদৌরা বিনতে হাবিবা সাংবাদিকদের বলেছেন, আমাকে চালক জানিয়েছেন ঘটনা। সেখানে শ্রমিকরা গাড়ীটি ভাংচুর করেন ও ছাত্রীদের গায়ে পোড়া মবিল দিয়েছেন। একই সময়ে সিদ্ধিরগঞ্জে একটি অ্যাম্বুলেন্সে পোড়া মবিল লেপে দেন শ্রমিকরা। অ্যাম্বুলেন্সের চালক আব্দুল্লাহ জানান, রোগী আনতে তিনি যাচ্ছিলেন। শ্রমিকরা তার এম্বুলেন্সে মবিল লেপ্টে দেন।

রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও ব্যাপক তান্ডব চালান শ্রমিকরা। মহাখালী এলাকায় তারা প্রাইভেটকার ও মোটর সাইকেল চলাচলে বাধা দেন। প্রাইভেটকারগুলো থামিয়ে চালককে নাজেহাল ও তাদের মুখে কালি মাখিয়ে দেয়া হয়। যারা নিজেরা গাড়ী ড্রাইভ করে ছেলে-মেয়েদের স্কুলে নিয়ে বা নিজে অফিসে যাচ্ছিলেন তারাও নাজেহাল হয়েছেন।

বিআরটিসি বাস চলতেও বাঁধা
সরকার নিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচলেও বাধা দিয়েছেন শ্রমিকরা। এমনকি, সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহন করা বাসও চলতে দেননি তারা। সকালে বিআরটিসির গাজীপুর ডিপো থেকে কয়েকটি বাস ছাড়লেও পরিবহন শ্রমিকদের বাধায় সেগুলো আর চলতে পারেনি। এ সময় বাসচালক ও সহকারীদের মারধর করা হয়। সিএনজিচালিত অটোরিকশা থামিয়ে যাত্রীদের নামিয়ে দেয়া হয় ও চালকদের মারধর করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিআরটিসির গাজীপুর ডিপোর ম্যানেজার বুলবুল আহমেদ বলেন, সকালে আমি কিছু বাস বের করেছিলাম। কিন্তু গাজীপুর চৌরাস্তা ও বোর্ডবাজারে সেগুলো আটকে দেন শ্রমিকরা। কয়েকজন চালককে পিটিয়েছেন তারা।

পথচারীদের সীমাহীন দুর্ভোগ
এদিকে, শ্রমিকদের কর্মবিরতিতে দুর্ভোগ বেড়েছে মানুষের। গতকাল জরুরী কাজে অনেকে বের হলেও নির্দিষ্ট গন্তব্যে সঠিক সময়ে পৌছতে পারেননি। অনেকেই রিকশায় করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন। অনেকে হেটে গন্তব্যে গেছেন। অনেক দূর পাল্লার পথচারী বাস টার্মিনালে গিয়ে গাড়ী না পেয়ে বাসায় ফিরে গেছেন। ঢাকায় যাদের বাসা-বাড়ি নেই এমন অনেক মানুষকে টার্মিনালেই অবস্থান করতে দেখা গেছে।

রিকশা, অটোরিকশা চালকদের নৈরাজ্য
সুযোগ পেয়েছে রিকশা ও অটোরিকশা চালকরা। গণ পরিবহন না থাকায় ওইসব পরিবহনের কদর বেড়েছে। কিন্তু এই সুযোগে রিকশা ও অটোরিকশা চালকরা কয়েকগুন ভাড়া আদায় করেছেন যাত্রীদের কাছ থেকে।

পুলিশের সামনেই নৈরাজ্য
গতকাল সকালে যাত্রাবাড়ি এলাকায় কয়েকটি গাড়ীর চালককে যখন শ্রমিকরা মারধর করছিলেন তখন তার কাছেই দাড়িয়েছিলেন একদল পুলিশ। কিন্তু তারা কোন এ্যাকশনে যাননি। গাজীপুর থেকে একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, শ্রমিকরা যখন বিআরটিসি বাস চলতে বাধা দেন তখন যাত্রীরা পুলিশের সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ জানিয়ে দেয় ‘তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কাজ করছেন’।

দাবী আটটি
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেছেন, ৮ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে এই কর্মবিরতি। দাবিগুলো হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনায় মামলা জামিনযোগ্য করতে হবে, শ্রমিকদের অর্থদন্ড পাঁচ লাখ টাকা করা যাবে না, সড়ক দুর্ঘটনা তদন্ত কমিটিতে শ্রমিক প্রতিনিধি রাখতে হবে, ড্রাইভিং লাইসেন্সে শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণী করতে হবে, ওয়েটস্কেলে (ট্রাক ওজন স্কেল) জরিমানা কমানোসহ শাস্তি বাতিল করতে হবে, সড়কে পুলিশের হয়রানি বন্ধ করতে হবে, গাড়ীর রেজিস্ট্রেশনের সময় শ্রমিকদের নিয়োগপত্র সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সত্যায়িত স্বাক্ষর থাকার ব্যবস্থা করতে হবে এবং সব জেলায় শ্রমিকদের ব্যাপকহারে প্রশিক্ষণ দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করতে হবে এবং লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করতে হবে। আজ সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত এই ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে।

  •  

সর্বশেষ ২৪ খবর