খেলার সাথী

প্রকাশিত: ১:৪২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০১৮

খেলার সাথী

শরীফ সাথী

ক্ষুদ্র একটি গ্রাম পাটাচোরা। যেখানে প্রকৃতির গুনাগুণের নেই তুলনা। যা বিরাজ করে সর্বক্ষণ। আমাদের চোখ প্রকৃতির আনন্দদায়ক, বেদনাদায়ক সব কিছু ধরে রাখতে সক্ষম। সবুজ নীল সাদা কালো লাল হলুদের নানা রঙের বিচিত্র সমাহার। প্রকৃতির অপরুপ নিদারুন মনোহর শিহরনে মন পুলকিত। নদীর কিনারায় বটমূলে বসে মন চায় প্রকৃতি প্রেমে মুগ্ধ হতে। গ্রাম্য পরিবেশের মায়াবী দৃশ্য বড়ই মনোহর, মনোরম। ভৈরবও মাথাভাঙ্গা নদী দিয়ে ঘেরা গ্রামটির মাথাভাঙ্গা নদীটির পাশেই পাটাচোরা সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়। স্কুল প্রাঙ্গণে সবুজ শ্যামল খেলার মাঠের চতুর্দিকে আম গাছের সমারোহ। নদীর ধারেই দু’টি কৃষ্ণচূড়া গাছ পেখম মেলে ফুলে ফুলে সজ্জিত। কয়েকটি বসার আলসে খানা এমন পরিবেশে কচি কচি শিশুদের বেশ ভালোই মানিয়েছে।

দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে রবি ও রেশমা। দু’জনের বেশ মিল। আবার মাঝে মাঝে অমিল ও লক্ষ্য করা যায়, পরীক্ষায় রবি প্রথম হলে রেশমা রেগে যায়, রবি রেশমাকে বিভিন্ন মন খুশীর কথা বলে রাগ ভাঙ্গায়।
-দ্যাখ রেশু! তুই অযথা রাগ করিস ক্যান।
-উ হু রাগ করব না? তুই এক হস্ ক্যান?
-রেশু ধর এক তোকে আমি দিলাম।
-বললেই হলো, তুইতো কালকে বললি, এক তোকে দিলাম। কিন্তু আম্মু আজ তোকে এক ডাকলো ক্যান?
– আমি তোর সাথে ঝগড়া করবো না। চল তোর আম্মুর কাছে। বলে তোকে আমার রোল এক হওয়া এক, তোকে দেব।
– সত্যি যাবি রবি?
-হ্যা যাব।
– আমি যাব না।
-কেন যাবি না রেশু ?
-আমি যদি বলে তোর এক নিই, তাহলে তোকে দুই ডাকলে, তুই যদি আমার উপর রাগ করিস?
-আমি তোর মত রাগি নাকি? চল।
-না আম্মু বকবে ।
– সত্যি তোর আম্মু যা মারে না! সবার মাইর দেওয়া দেখে আমার খুব ভয় করে। তোর আম্মুর মোট্টা হাতের মাইর খুব জোর।
-এই রবি আম্মুর মোট্টা হাত বল্লি ক্যান?
-তোর আম্মুতো ইয়া বড় মোটা, তাই।
-আমি আমার আম্মুকে বলে দেব, তোর সাথে মিশবো না।
-রাগিশ না রেশু, চল আমাদের ভূইয়ের আখ খেয়ে আসি গে।
-এত ভয়! আমাকে আখ দিয়ে, নালিশ করতে বন্ধ করতে চাও।
-না মানে আমি আর তুই ক্লাসে এক দুইতো খুব মিল তাই না রেশু ? চল না ভালো বড় বড় সুন্দর সুন্দর মিষ্টি মধুর আখ…
-চল রবি! আর কোনদিন এমন কথা বেলবে না কিন্তু…

রেশুর আম্মুর নাম উর্মিলা হার্ট ডাবলিউ। সবাই ম্যাডাম ডাবলিউ বলে ডাকে। আসলে ম্যাডাম ডাবলিউ এর শরীর যেন হাতির মত। উচ্চতা ঠিক পাঁচ ফিট ছয়-সাত ইঞ্চি হবে হয়তো অনুমানে। রেশুর খুব মোটা উঁচু লম্বা আব্বার নাম ড্রাগলেট হার্ট। ছ’ফুট পেরুনো ড্রাগলেট হার্ট হৃদয় খানদানী দর্শনা চিনি মিলে চাকরি করে। রেশুর আম্মা ডাবলিউও একজন শিক্ষিকা।

রবি ও রেশু আখের মাঠে গেল। মাঠে গিয়ে রবি তার চাষী আব্বাকে বলল, আব্বা রেশু আখ খাবে, একটা আখ দাও?
রেশু বলল, আংক্যাল রবি আমাকে নিয়ে এলো আখ দেবে বলে।
রবির আব্বা সহজ সরল সিমপল মিয়া বলল, মা, আমি তোমার ঠ্যাংকেল না, বলো চাচা।
রবি বলল, আ-হা-হা-হা-আব্বা।

রেশু বলল, আমার আম্মুকে বললাম রবির আব্বা আমার কি হন? আম্মুতো আমাকে বলেছিল রবির আব্বা তোমার আংকেল হন ।
-ভুল বলেছে, আমি তোমার চাচা…
-চাচা একটা আখ দাও চলে যাই।
-নাও মা…
রবি বললো, এ -রে-রে রে আব্বা আবার মা বলল।
রবির দিকে চেয়ে উ-উ-উ-জিহবা নেড়ে রেশু আখে মারল এক কামড়। শক্ত আখে সামনের একটি দাঁত ভেঙ্গে গেল রেশুর। যে দাঁত আগে থেকে নড়ছিল।
দাঁত ভাঙ্গা দেখে রবি বলল, ও-ও ও রেশু বুড়ি হয়ে গেছে। ও বুকড়ি…।
রেশু ভাঙ্গা দাঁতের ফাঁক দিয়ে জিহবা নেড়ে চলে গেল। আখের খোসা দাঁত দিয়ে ছিলে খেতে খেতে রবির ও একটি দাঁত নড়ে যায়।

পরদিন আবার স্কুলে গেল ওরা দু’জন। রবি রেশুকে বলল ও বুকড়ি কেমন আছিস?
রেশু বলল, রবি তুই আমাকে বুকড়ি বললি, বল্, আমি তোর সাথে কথা কবো না ।
-রাগ করছিস বুকড়ি ?
-আবার বুকড়ি।
-ও ভুল হয়ে যাচ্ছে রেশু, তুই রাগ করিস না। এই দেখ এই দাঁতটি আমারও নড়ছে।
রবি দাঁতে হাত দিয়েই নিজের দাদার কথা মনে পড়ে যায়, অমনি স্মৃতি পাঠ বলতে
থাকে-
দাদার কথা পড়ে মনে /হাটতাম আমরা রনেরনে /দাদার দলোপতিতে /হত আমাদের চলিতে
/দাদা যখন হাটতেন /ভয়ে সবাই কাঁপতেন /দাদা দাদির বকতেন /দাদি কাজ করতেন
/দাদা কান ধরতেন /আমার ভালবাসতেন /দাদা গেল চলে /ভাসলো চোখের জলে।

অনেক ছেলে মেয়েই মনোযোগ সহকারে রবির বলা ছন্দ কবিতাটি শুনলো। এক সময় রেশু বলে উঠল, রবি তাড়াতাড়ি চল- ঐ দেখ আম্মু ক্লাসে গেল।
রবি ও রেশু ক্লাস-রুমে প্রবেশ করতেই ম্যাডাম ডাবলিউ বলল, এই তোমরা কোথায় ছিলে?
রেশু বলে উঠল, আম্মু রবির দাঁত নড়ছে। তাই…
-রবি এদিকে আসো।
ডাকটি শোনার সাথেই চমকালো রবি। রবি একবার রেশুর দিকে তাকিয়ে মুখটা কাচুমাচু করল। ম্যাডামের দেখে সবাই ভয় পাই। রবি নিকটে যেতেই, ম্যাডাম বলল, দেখি কোন দাঁতটা নড়ছে—
রবি বলল, এইটা ম্যাডাম।
ম্যাডাম হাত দিয়ে জোরে চাপ দিল। দাঁত ভেঙ্গে গেল।
রেশু বলে উঠল, ও রে-রে রবি বুকড়া হয়ে গেছে। মুখ ভাঙানো ঢঙে আরো বলল,
‘রবি এখন বুড়ো,
দেবো মাছের মুড়ো;
করবে খেয়ে গুড়ো।’

ম্যাডাম রেশুকে বলল, তুমি কী? তুমিও তো বুড়ি।
আর ক্লাসের উপস্থিত ছাত্রছাত্রী সবাই হেসে উঠল ।

একদিন ঝিরঝির বৃষ্টি হলো সকালে। মাটির রাস্তা স্যাঁস্যাঁতে, পা টিপে যাওয়া ছাড়া উপায়ই নেই। রবি আর ম্যাডাম স্কুলে যাচ্ছে। ম্যাডাম রবিকে খুব আদর করে। রবির গোলগাল ফুটফুটে উজ্জ্বল চেহারা। তাও আবার পড়াশুনায় খুব ভালো। ক্লাসে রোল নম্বর এক। ম্যাডাম নিজ ছেলের মত রবিকে ভালোবাসেন। রেশু আজ আর স্কুলে গেল না। ওর বাবা দর্শনা থেকে বাড়ি আসায় এবং সকালেই বৃষ্টি হলো এজন্যও আজ তার স্কুলে উঁচুনিচু জায়গায় পা পড়লো ম্যাডাম ডাবলিউয়ের। পিচ্ছিল কাদায় স্লিপ করে হাতির মত মোটা শরীর ধপাস করে পড়ল। ছোট্ট রবি পড়লো হাতির নিচে। রবি একেবারে চেপ্টা হয়ে গেছে। বুকের কচি খাঁচা মনে হয় ভেঙ্গে গেছে। রবির মুখের কথা স্পষ্ট বের হচ্ছে না। কাঁদতে লাগলেও। ম্যাডামের হাতির মত দেহ নিয়ে উঠতেই পাঁচ মিনিট।

রবি হাত ভর করে উঠতে গিয়ে দেখলো ভেঙ্গে গেছে বাম হাত। নড়াচড়া করতে পারছেনা। সর্বনাশ। ম্যাডাম ওকে ধরে তুলতে যাবে, আর রবি ভাব দেখেই নিজের ডান হাত দিয়ে বাম হাত ধরে কি জোরে না পাড়ি দিলো বাড়ি।
ম্যাডাম রবির পিছুই পেল না। ম্যাডাম ভাবলো এ আজ কেমন হয়ে গেলো। রবির এ অবস্থা লোকে দেখলে বা জানলে কি বলবে? লজ্জায় মুখ লাল হলো।
এদিকে বাড়িতে সিমপল মিয়া রবিকে বার বার জিজ্ঞাসা করলো হাত কিভাবে ভাঙ্গলো? রবি বলল, রাস্তার পিচ্ছিল কাদায় পড়ে ভেঙ্গে গেছে আব্বা।
এমন সময় ম্যাডাম রবিদের বাড়ি হাজির। রবি ম্যাডামকে দেখেই তাড়াতাড়ি ঘরের মধ্যে লুকালো।
ম্যাডাম বলল, রবি শোন বাবা?
আর শোনা ওর যা ভয় হয়েছে। ম্যাডাম রবির বাবা সিমপলকে বলল, আমার জন্য রবি পড়ে গেছে এবং ওর হাত ভেঙ্গে গেছে।
-কই রবিতো বলল এমনিই পড়ে ভেঙ্গে গেছে।
-রবি পড়ে গিয়ে হাত ভেঙ্গে গেছে, শুধু এই বলেছে, আর কিছু…
-না, আর কিছুই বলেনি। জানতে চাইলাম কিভাবে পড়লি ? হাত কিভাবে ভাঙ্গলো, ও শুধু ঐ কথায় বলল।
ম্যাডাম ভাবলো রবি এভাবে বলেছে তার মানে আমার সম্মন্ধে কিছুই বলেনি।
তাহলে স্যারকে কিভাবে মেনে চলতে হয়, ভদ্র ব্যাবহার করতে হয় তা রবিতো বেশ ভালো বুদ্ধিমান।
সিমপল মিয়া বলে উঠল, কি ভাবছেন?
-কই তেমন কিছুই না। রবিকে দ্রুত ডাক্তার খানায় নিয়ে যাও। টাকা আমি দিচ্ছি…
– না টাকা আপনি দেবেন কেন? রবি এদিকে আয় বেরিয়ে আয় বাবা।
(রবি ঘরের কোণে চুপটি মেরে বসে গুমরি করে কাঁদছে।)
-ওতো আমার সন্তানের মত তাই? আমার রেশুর সাথে সব সময় খেলা করে।
ডাক্তার খানায় নিয়ে গেল রবিকে । ম্যাডাম বাড়ি গিয়ে রেশুকে বলল, রবির হাত ভেঙ্গে গেছে। রেশু যেন আকাশ থেকে পড়লো।
-আম্মু কি ভাবে ? কোথায় এখন রবি ? আমি দেখতে যাব।
– পিচ্ছিল রাস্তায় পড়ে গিয়ে, ও তো ডাক্তার খানায় গেল।
-কখন আম্মু ? এতক্ষণ কেন আমি জানিনা ?

পাটাচোরা আলম ডাক্তারের ক্লিনিকে রবি ভর্তি হলো। ম্যাডাম রবির কাছে দেখতে আসতে গিয়ে ভাবলো, রবিতো আমার দেখে ভয় পাবে। আমি এখন না গিয়ে কিছু ফল কিনে পাঠাই। অবশেষে রেশুকে দিয়েই আপেল আঙ্গুর কমলা বেদেনা হরেক রকম ফল কিনে রবির জন্য পাঠালো। ক্লিনিকে রেশু গিয়ে রবির হাত ভাঙ্গার করুন অবস্থা দেখে, রেশু সহ্য করতে পারলো না। সেই হাস্যোজ্বল চেহারাহীন রবির মলিন মুখ খানি দেখে কেঁদে ফেললো। রবির পাশে বসলো।
রবি বলল, এই বুকড়ি কাঁদছি কেন ?
রেশু বুকড়ি ডাক শুনায় হেসে ফেললো। রবি রেশুর চোখ মুছে দিলো।
রেশু বলল, বুকড়া আম্মু পাঠালো আমাকে।
-তোর আম্মু এসেছে নাকি…
-না আসিনি। আমি একাই এলাম।
রবি স্বস্তিতে নিশ্বাস ফেললো ওর আম্মু ম্যাডাম ডাবলিউ না আসায়।
-হা কর রবি। এই নে মুখে আপেল দিতেই রবি এক কামড় মেরে ডান হাত দিয়ে ঘুরিয়ে রেশুর মুখে দিলো।
বেশ ইঞ্জয়। ওদিকে ডাক্তার আলমও কলা বিনিয়ে কেবল মুখে দেবে। ঐ মুহুর্তে রবি ও রেশুর ভাব দেখে নার্সের মুখের দিকে ঠেলে ধরলো। নার্সের মুখের বিতরে অর্ধেক কলা। কামড় দিলেই অর্ধেক পড়ে যাবে, কারণ হাতে তার প্রয়োজনীয় জিনিস ধরার ও ক্ষমতা নেই। নার্স আবার কি করলো ? মুখ বাড়িয়ে দিল ডাক্তার আলম এর দিকে। আর কি? মুখে মুখে চোখে চোখে একাকার ডাক্তার নার্স। ডাক্তার আলমের মাথায় চুল খুব কমই আছে। তবুও বিয়ের কথা ভাবেনি এতদিন। কিন্তু আজ এই রবি রেশুর ভাব দেখে, ডাক্তার যেন নার্সের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
এমন সময় রেশু বলল, রবি ঐ দেখ, ডাক্তার আর নার্স কিভাবে কলা খাচ্ছে দ্যাখ। রবি আর রেশু এ রে রে রে চিৎকার করে হাসলো। ডাক্তার ও নার্স থতমত খেয়ে দ’জনা তাকিয়ে হেসে চলে গেল ভিতরে।
অনেক ঘটনার মাঝে পেরুলো অনেক সময়। রবি আর রেশু পঞ্চম শ্রেণীতে উঠল। একই নিয়মে ওদের পড়াশুনা, চলাফেরা। স্কুলে আজো গিয়েছে দু’জন । রবি রুমে আগে প্রবেশ করে বলল, তোকে আজ ঢুকতে দেবে না ক্লাস রুমে। জোরাজুরিতে দরজা ঠেলা মারলো রবি। দরজার কবজা বসানো ফাঁকে রেশুর আঙ্গুল চলে গেল। রেশুর উ-হু চিৎকার করে কাঁদার শব্দ। তাড়াতাড়ি রবি দরজা খুলেই দেখে রেশুর আঙ্গুল দিয়ে রক্ত ঝরছে। হাতের আঙুলের একটা নোটতো উঠেই গেছে। রবির মুখে কোন কথা নেই। শুধু চোখে চেয়ে । রেশু ও রবির চোখের দিকে তাকিয়ে কান্নার শব্দ না করলেও চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে, রবি হাত ধরে রেশুর আঙ্গুল খানা মুখের ভিতর নিয়ে বেশ অনেক্ষণ চোখের দিকে তাকিয়ে।
ভাবছে এ আমি কি করলাম? আমার জন্যই রেশুর নোখ উঠে গেলো। ও যদি এমন ঘটনা ওর আম্মুকে বলে দেয়, তাহলে আর নিস্তার নেই। ম্যাডাম এর কানেও খবর গেল।
ম্যাডাম ডাবলিউয়ের আসতে দেখে হাত ছেড়ে রবি কাঁদতে কাঁদতে মরি বাঁচি দৌঁড়ে পালাল বাড়ি। রেশু রবির বিরুদ্ধে ওর আম্মুর কাছে কিছুই বলল না, ম্যাডাম তাড়াতাড়ি রেশুকে নিয়ে বাড়ি চলে এলো।

এদিকে রবির সময়ই যাচ্ছেনা কিভাবে রেশুর সঙ্গে দেখা করি।
কথা বলি। ভাবতে ভাবতে বিকালে খেজুরের পাটালি ছিন্নি নিয়ে রবি রেশুদের ঘরের জানালার পাশেই গেল। ঘরের জানালা খোলা। রেশু একা বসে রয়েছে। রবিকে দেখে রেশু বলল, তোর সাথে কথা নেই, তুই ওভাবে পালিয়ে এলি।
-তোর আম্মুর ভয়ে রেশু?
-আম্মুর ভয়ে—
-এই দা রেশু খেজুরের পাটালি ছিন্নি তোর জন্য নিয়ে আসলাম। কিভাবে আসবো?
তোর আম্মু কই?
– আম্মু বাইরে গেছে।
রবি জানালা দিয়ে ঘরে উঠে পড়ল।
রেশু বলল, তুই তো একটা আস্ত চোর হবি ? যেভাবে উঠলি।
-রেশু হলে শুধু তোর জন্যই হবো । এই নে বলে মুখে তুলে দিল পাটালি। ওদের দু’জনার কথা বার্তার শব্দ শুনতে পেল ম্যাডাম ডাবলিউ।
বলল, রেশু তুই সাথে কথা বলছি ?
রেশু বলতে যাবে আর রবি ঘপ করে রেশুর মুখে হাত দিয়ে বলল, রেশু কসম লাগে, আমার নাম বলিস না।
রেশু ছোট করে বলল, আমি যদি বলি।
পায়ের শব্দ শুনা যাচ্ছে যে ম্যাডাম আসছে। রবি জানালার পাশে গুটি গুটি পায়ে এগুলো।
এমন সময় রেশু বলল, আম্মু রবি এসেছে।
রবি দ্রুত জানালা দিয়ে নেমে রেশুর উদ্দেশ্যে জিহ্বা নাড়িয়ে, হাত ঘুরিয়ে, মুখ ক্যাচুম্যাচু করে বলল, এ আম্মু রবি এসেছে, ম্যাডাম প্রবেশ করেই বলল, কই রবি?
আর রবি! শূন্য বাতাস ছাড়া আর কেউ নেই কোথাও ।

প্রাইমারি শেষ পড়া শেষ হলো রেশুর। ওরা আর এ গাঁয়ে থাকবেনা চলে যাবে শহরে। রেশুর আম্মু স্কুল পরিবর্তন করেছে আর ড্রাগলেট র্হাট দর্শনা চিনি মিলেতো আছেই। তাই ওরা বাসা বানিয়েছে দর্শনা শহরে। ওদের নিজেদের সুযোগ সুবিধা মত।
আজ পাটাচোরা গ্রামের সব মায়া মমতা বিলিন করে চলে যাচ্ছে। কাদা বালির গ্রামে সোনালী রোদ ঝিকমিক করে যে গ্রাম। চর্তুদিকে পানি ঢেউ তুলে বর্ষায় খেলা করে যে গ্রাম। সবজ সমারোহে ছাওয়া ফুল পাখিদের মিলনমেলা মমতা মধুর পরিবেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সে পাটাচোরা গ্রামকেউ আজ ওদের চলে যেতে দিতে হচ্ছে। গ্রামকে যে যতোই ভাল চাক টাকা পয়সা হয়ে গেলে আর কেউ কাদা বালির ভিতরে থাকতে চায় না। চায় শহরে পরিবেশ। কাদামাটির রাস্তা পরিবর্তন করে চায় পিচরোড পাকা রাস্তা পাকা ঘরবাড়ির উন্নত পরিবেশ।
রেশু রবিকে আচ্ছা করে মনের মতো খুঁজলো। পেলো না। রেশুরা সবাই ঘাট পেরিয়ে কাঞ্চনতলা হয়ে কার্পাসডাঙ্গা মোড় ঘুরে যাবে এই মনস্ত করলো।
এদিকে রবি মাঠ হতে খেজুর গাছের কাটা মাথার মেথী সংগ্রহ করেছে রেশুকে দেওয়ার জন্য। বাড়ি এসে খোঁজ করে রেশুকে পাচ্ছেনা। জানলো এই মাত্র তারা চলে গেল। রবি দৌঁড় আরম্ভ করলো। খেয়াঘাটে পৌঁছতেই পার হয়ে ওপারে ওরা। রবি শুধু দু’নয়ন ভরে চেয়ে চেয়ে দেখছে ওপারে তার খেলার সাথী রেশুকে। কিন্তু কোন কথা বলতে পারছে না। আসলে ম্যাডাম ডাবলিউয়ের দেখে সে এখনো ভীতু। রেশুও চেয়ে চেয়ে দেখছে রবিকে। চোখের কোণে জল আসলেও কথা বলা হল না। জলে ছলছল চোখে রবি মনে মনে বলল, রেশু! এই রেশু, আমার খেলার সাথী, পড়ার সাথী। আমি তোর জন্য এত কষ্ট করে, খেজুর গাছের মাথা চিরে এই মেথী আনলাম। দুজন মিলে খাবো বলে। আর তোকে দিতে পারলাম না । তুই চলে গেলি। এই রেশু তোকে ছাড়া যে অন্য সাথী ভাললাগে না আমার। তুই কি আর কোন দিন ফিরবিনা? এই গ্রামে? এই নদী, তুই যদি আমার সামনে বাঁধা না হতিশ রেশুকে মনে হয় আমি কাছে গিয়ে মেথীগুলো দিতে পারতাম।

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর