কারাগারের জায়গাতেই পরিবেশ ধ্বংস
নগরের পরিবেশ দূষণের এ দায় কার?

প্রকাশিত: ৫:২৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০২১

<span style='color:#077D05;font-size:19px;'>কারাগারের জায়গাতেই পরিবেশ ধ্বংস</span> <br/> নগরের পরিবেশ দূষণের এ দায় কার?

জায়গাটি সংরক্ষণের জন্য খুব শীঘ্রই টেন্ডার আহ্বান করা হবে : সিনিয়র জেল সুপার


আব্দুল খালিক
নগরের পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব যাদের হাতে ন্যস্ত। তাদের হাতেই দূষিত হচ্ছে নাগরিক পরিবেশ। খুদ পরিচ্ছন্নতা কর্মীরাই তাদের বাসস্থান ‘ক্লিনার কলোনী’র সামনের জায়গাটাকে নর্দমায় পরিণত করে রেখেছে। যার দুর্গন্ধে শ্বাস নিতেও কষ্ট হয় বাণিজ্যিক ভবন ‘রঙমহল টাওয়ার’ এর ব্যবসায়ী, ক্রেতা ও অফিস কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। এমনকি পৌর বিপনী মার্কেটসহ আশপাশের ব্যবসায়ী ও পথচারীরাও ভোগান্তিতে রয়েছেন জায়গাটি নিয়ে। দুর্গন্ধ আর ঘৃণিত প্রাণী শূকরের তান্ডবে অনেকটা নাজেহাল তারা।

 

তবে, ক্লিনারদের এমন কর্মকান্ডের জন্য শুধুই কী তারা দায়ী, নাকি জেল কর্তৃপক্ষেরও দায়ভার রয়েছে- জনমনে দেখা দিয়েছে এমন হাজারো প্রশ্ন। জেল কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন থেকে তাদের নিজস্ব ভূমি সংরক্ষণ না করে এভাবে পরিত্যাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে সরকারি কোটি টাকার ভূ-সম্পত্তি নষ্ট করার পেছনে কি কারণ থাকতে পারে- এনিয়েও প্রশ্নের শেষ নেই।

 

জানা যায়, নগরের রঙমহল টাওয়ার সংলগ্ন পূর্বদিকের খালি জায়গাটি হচ্ছে সিলেট জেল কর্তৃপক্ষের। যেটি আগে স্টাফ কোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহার করা হতো। অথবা জেল পুলিশ বা তাদের স্টাফদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হতো। এখনও ওই জায়গাতে ছোট ছোট টিনশেড ঘর বিদ্যমান। কারা কর্তৃপক্ষের জন্য জায়গাটি এখন পরিত্যাক্ত হলেও অপরাধী, মাদক সেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য এটি এখন নিরাপদ অভয়াশ্রম। এমনকি সিলেট সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের কাছে এই ঘরগুলি এখন সর্বভূক চতুষ্পদ জন্তু শূকর পালনের খামার। এখানে শূকর পালন, ভরণ-পোষন এমনকি শূকরের বংশ বিস্তারের জন্যও খামার হিসেবে ভূমিকা পালন করছে জেল কর্তৃপক্ষের এই খালি ঘরগুলো। সেই সাথে বিস্তার লাভ করছে ডেঙ্গু ও এডিস মশা। নর্দমায় পরিণত জায়গাটিতে এডিস মশার লার্ভা বিস্তারের শতভাগ সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও আধ্যাত্মিক নগর সিলেটের পবিত্র ভূমিতে শূকরের খামার থাকাটা নিয়েও জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

 

স্থানীয় রঙমহল টাওয়ার ও পৌর বিপনী মার্কেটের একাধিক ব্যবসায়ীরা জানান, জেল কর্তৃপক্ষের পরিত্যাক্ত জায়গাটি মূলত সিলেট সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরাই ব্যবহার করছে। এখানে বিদ্যমান ছোট ছোট ঘরগুলোকে শূকর পালনের খামার হিসাবে ব্যবহার করে থাকে ক্লিনাররা। এমনকি সড়কের লাগুয়া অনেক ঘর আছে, যেগুলো অপরাধ আস্তানা হিসেবে পরিচিত। তীর শিলং, ঝান্ডু-মান্ডুসহ হরেক রকম জুয়ার আসর ও মদ, গাজা, হেরোইন সেবনের নিরাপদ আশ্রম হিসেবেও ঘরগুলো ব্যবহার করে অপরাধীরা। প্রকাশ্য দিবালোকে এসব ঘরে জুয়ার আসর বসলেও প্রশাসন থাকে নিরব ভূমিকায়। প্রায় একবছর আগে ডিবি পুলিশ অভিযান চালিয়ে মাদক উদ্ধারসহ এক মাদকসেবীকে আটক করলেও এরপর আর কোনো অভিযান চোখে পড়েনি। এক কথায় এলাকাটি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক অভিযানমুক্ত ও নিরাপদ। অদৃশ্য কারণে, এখানকার সব অপরাধই যেনো বৈধ- অনেকটা ক্ষোভের সাথে কথাটি যোগ করেন ব্যবসায়ীরা।

 

সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের ধোপাদিঘীরপাড়স্থ পৌর বিপনী মার্কেট (সন্ধ্যা বাজার) ও রঙমহল টাওয়ারের মধ্যখানে রয়েছে সিলেট জেল কর্তৃপক্ষের কোটি টাকার ভূ-সম্পত্তি। যেখানে রয়েছে ছোটÑবড় প্রায় ১০/১৫টি টিনশেড ঘর। এর মধ্যে ২/৩টি ঘর সড়কের (ড্রেন) একেবারে নিকটবর্তী এবং অপর ঘরগুলি একটু দক্ষিণাবর্তে। ঘরগুলিকে নিজেদের মতো করে ভাগ করে দুই-তিনটি ঘরে বিভিন্ন রকম জুয়ার আসর ও মাদক সেবনের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে অপরাধীরা। আবার কিছু ঘর দেশীয় সর্বভূকপ্রাণী শূকর পালনের খামার হিসেবে ব্যবহার করছে সিলেট সিটি করপোরেশনের (ক্লিনাররা) পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। তবে, খামার ও অপরাধ আস্তানা এই দুইয়ের মধ্যেই অপরাধী ও ক্লিনারদের যোগসূত্র রয়েছে বলে তদন্তে পরিলক্ষিত হয়। জায়গাটির পূর্বাবর্তে রয়েছে পৌর বিপনী মার্কে বা সন্ধ্যা বাজার বা পত্রিকা এজেন্সি। এর পাশেই রয়েছে ক্লিনারদের ময়লার স্তুপ। যেখানে দুর্গন্ধে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করার অনেকটা দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। পশ্চিম দিকে রয়েছে রঙমহল টাওয়ার। টাওয়ারের পাশ ঘেঁষেই রয়েছে ক্লিনার কলোনীর রাস্তা। একটু ভেতরে ক্লিনার কলোনীর ছয়তলা ও চারতলা ভবন। যেখানে সিসিকের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা তাদের স্বপরিবারে বসবাস করে থাকেন। এর সামনে খালি জায়গাতে বিভিন্ন অবস্থায় পড়ে আছে শত শত শূকর। যাদের খাওয়ানো ও রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বে রয়েছে ওই পরিচ্ছন্নতা কর্মীরাই। এর একটু উত্তরে বিদ্যমান ছোট ছোট টিনশেড ঘরেও অবস্থান করতে দেখা যায় শ’খানেক শূকরকে। যাদের বাচ্চা প্রসব করানোর জন্য এসব ঘরে রাখা হয়েছে বলে ক্লিনার সূত্রে জানা যায়।

 

সব মিলিয়ে জায়গাটি এখন বড়সড় এক নর্দমায় পরিণত হয়েছে। যেখান থেকে অনবরত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে রঙমহল টাওয়ার এলাকায় এই দুর্গন্ধের প্রভাবটা অনেক বেশি। ফলে ব্যবসায়ী-ক্রেতা, ব্যাংকসহ বিভিন্ন অফিসে আগত গ্রাহক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রয়েছেন চরম ভোগান্তিতে। এতে নগরের সৌন্দর্য্য ও সুনাম যেভাবে নষ্ট হচ্ছে, ঠিক সেভাবে নষ্ট হচ্ছে নগরের পরিবেশও।

 

রঙমহল টাওয়ারের পরিচালক ও রাজনীতিবিদ বিজিত চৌধুরী জানান, সিলেট কারা কর্তৃপক্ষ তাদের মালিকানা জায়গাটি দ্রুত সংস্কার বা সংরক্ষন না করলে এটি পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এমনটি হলে পরে এর সম্পূর্ণ দায় তাদেরকেই বহন করতে হবে। দিন দিন যে হারে জায়গাটির অপব্যবহার হচ্ছে, সেটি একটা সময় নগরের পরিবেশ ও নাগরিক জীবনমানের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে বলেও তিনি মনে করেন।

 

বিজিত চৌধুরী বলেন, সিলেট সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের বসবাসের জন্য ওই ভূমির দক্ষিণাংশে একটি ছয়তলা ও একটি চারতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণকালীন সময়ে যাতায়াতের সুবিধার্থে রঙমহল টাওয়ারের পাশ ঘেষে একটি রাস্তা নির্মাণ করা হয়। যেটি শুধুমাত্র কাজের সুবিধার্থে সাময়িক সময়ের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে- সিসিকের পক্ষ থেকে এমনটি জানানো হলেও এখন এই রাস্তাটিই ওই ভবনের আসা-যাওয়ার একমাত্র রাস্তা হিসেবে স্থায়ীভাবে ব্যবহার হচ্ছে। এমনকি ওই রাস্তা দিয়ে তাদের পালিত শূকরগুলো বেরিয়ে টাওয়ারের সামনসহ রাস্তার অবাধে বিচরণ করতে থাকে। পথচারীদের শরীরের সাথে ঘেঁষে চলাফেরার করার ফলে তাদের পরিদেয় বস্ত্রের পবিত্রতা নষ্ট হওয়াসহ বিপাকে পড়তে হয়। এছাড়াও, কারা সিপাহীদের জন্য নির্মিত পরিত্যাক্ত টিনশেড ঘরগুলোতে যাতে কোনো অপরাধীদের আস্তানা না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও কারা কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

 

রঙমহল টাওয়ারের পরিচালক ব্যবসায়ী ফয়েজ আহমদ দৌলত জানান, এখানে মশার বিস্তার লাভের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি এডিস মশার লার্ভা থাকার সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যে হারে ময়লা আবর্জনার ছড়াছড়ি, সেটি খুবই নিন্দনীয়। মূলত, যাদের হাতে নগর সুরক্ষিত থাকার কথা, যারা নগরকে পরিচ্ছন্ন রাখার কথা, তারাই আবার কী করে নগরের একটি সুন্দরতম জায়গাকে নর্দমায় পরিণত করতে পারে- বিষয়টি নিয়ে নগর পিতা আরিফুল হক চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-১ এর সিনিয়র জেল সুপার (ভারপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন জানান, জায়গাটি সংরক্ষণের জন্য খুব শীঘ্রই টেন্ডার আহ্বান করা হবে। টেন্ডারের মাধ্যমে এর সীমানা প্রাচীর ও সৌন্দর্য বর্ধনের ব্যবস্থা করা হবে। এর অবৈধ ব্যবহার, মাদকের আস্তানা ও শূকর পালনের খামার নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানান।

সর্বশেষ ২৪ খবর