ফের ভূমিকম্পে সিলেটে আতঙ্ক, বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা

প্রকাশিত: ৭:১৪ অপরাহ্ণ, মে ৩০, ২০২১

ফের ভূমিকম্পে সিলেটে আতঙ্ক, বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা

আব্দুল খালিক
শনিবার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে চার বার ভূকম্পনের পর রবিবার আবারও ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে সিলেট। দফায় দফায় ভূমিকম্পে সিলেট জুড়ে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার ভোর থেকে বেলা ২টার মধ্যে মোট ৬-৭ বার ভূকম্পন অনুভূত হলেও আবহাওয়া অফিস মাত্র ৪ বারের কথা নিশ্চিত করে। তবে, ভূমিকম্পে প্রাথমিকভাবে সিলেটে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া না গেলেও নগরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পাঠানটুলা এলাকায় দুটি ছয়তলা ভবন একে অপরের ওপর হেলে পড়ে। এ অবস্থায় দুটি ভবনের বাসিন্দাদের অন্যত্র সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সিটি করপোরেশন (সিসিক) ও পুলিশ।

 

রবিবার বিকাল তিনটায় সিলেট নগরের ২৫টি ভবন ও মার্কেট ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সিলেট সিটি করপোরেশন। যার মধ্যে সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন ভবনও রয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালে সার্ভে করে নগরের ২৩টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর বাইরে শনিবার ভূমিকম্পে হেলে পড়া আরও দুটি ভবনকে নতুন করে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সিসিক। ওই ২৫টির মধ্যে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৬টি ভবন ও মার্কেট আগামী দশ দিন বন্ধ রাখতে সিসিকের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়াও একই সময়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অন্যান্য ভবনের বাসিন্দাদেরও অন্যত্র সরে যেতে বলা হয়েছে। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি এড়াতে সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট নগরের ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটগুলোতে গিয়ে এ নির্দেশনা দেন। এসময় তার সাথে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সদস্যরা ছিলেন।

 

এদিকে রবিবারে ফের ভূমিকম্প হওয়াতে সিলেটে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশ না হলেও বাংলাদেশে সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক ফাটলের কারণে বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে। এদিকে এই কম্পন থেকে বাঁচতে সচেতনতা ও মহড়ার কোনও বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সিলেট নগরে অনেক বহুতল ভবন রয়েছে। এছাড়া গ্রামীণ জনপদেও এখন বহুতল ভবন চোখে পড়ে। ভূমিকম্পে ভূমি ধস/ফাটল ও ভবন ধসের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। সেই সাথে নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের সৃষ্টি হতে পারে। এককথায় ভূমিকম্পে যেসব ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে তা মাথায় রেখে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। মহড়ার মাধ্যমে মানুষের আত্মরক্ষার কৌশল শিখাতে হবে।

 

সিলেট আবহাওয়া অফিসের প্রধান আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী জানান, রবিবার ভোর ৪টা ৩৫ মিনিটে সিলেটে মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে তা ছিল দুই মাত্রার। এর উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকা। তিনি বলেন, শনিবারও সিলেটে চার ঘণ্টার ব্যবধানে চারবার ভূমিকম্প হয়। ওই দিন সকাল ১০টা ৩৭ মিনিটে প্রথম ভূকম্পন অনুভূত হয়। এর পর সকাল ১০টা ৫১ মিনিট, সাড়ে ১১টা এবং বেলা ২টায় ফের ভূমিকম্প হয়। তবে এটা প্রথম ভূকম্পনের আফটার শক।

 

গণমাধ্যমের তথ্যমতে, প্রায় পৌনে ৫০০ বছর আগে ১৫৪৮ সালে প্রচণ্ড ভূমিকম্পে সিলেট এলাকায় ভূ-আকৃতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ওই সময় উঁচু-নিচু ভূমি পরিণত হয় সমতল ভূমিতে। পরবর্তীতে ১৬৪২, ১৬৬৩, ১৮১২ এবং ১৮৬৯ সালে হওয়া ভূমিকম্প সিলেটের ভূ-মানচিত্র পাল্টে দেয়। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন বিকালে সিলেটে যে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়, সেটি ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থ কোয়াক’ নামে পরিচিত। ওই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৮.৭! ভয়াবহ সেই ভূমিকম্পে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকার ব্যাপক ক্ষতি হয়। তৎকালীন সিলেট অঞ্চলের ৫ শতাধিক ভবন ভেঙে পড়ে। মানুষও মারা যায় অনেক। ওই ভূকম্পই সিলেটজুড়ে বিশালাকারের হাওর, বিল ও জলাশয়ের সৃষ্টি হয়। গত শতাব্দিতে সিলেট অঞ্চলে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৬। সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই হয়েছিল ভূমিকম্পটি।

 

এ শতাব্দিতে এখনও বড় মাত্রার ভূমিকম্প সিলেট অঞ্চলে হয়নি। ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় প্রতি ১০০ বছর পর বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটতে পারে। সিলেটে ১৮৯৭ সালে ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ভয়ানক ভূমিকম্পের পর পেরিয়ে গেছে ১২৩ বছর। ফলে যে কোনো সময় বড় ধরনের আরেকটি ভূমিকম্পের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফরাসি ইঞ্জিনিয়ারিং কনসোর্টিয়াম ১৯৯৮ সালে যে জরিপ চালায় সে জরিপে বলা হয়, সিলেট অঞ্চল ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় ভূকম্পন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। সাম্প্রতিক সময়ে এখানে ঘন ঘন ভূ-কম্পন হচ্ছে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম মাকসুদ কামাল বলেন, ‘বাংলাদেশে বড় ভূমিকম্প হওয়ার শঙ্কা তো আগে থেকেই আছে। সিলেটে কম্পন অনুভূত হয়েছে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের মেঘালয়। সেখানে অসংখ্য ভূতাত্ত্বিক ফাটল রেখা আছে। যার ফলে বড় ভূমিকম্প বা ছোট ভূমিকম্প দুটোই হতে পারে।’

 

তিন বলেন, ‘১৮৯৭ সালে এই এলাকায় একটি বড় ভূমিকম্প হয়েছিল। সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার আন্দুলেক তার স্বাক্ষী। মূলত ওই ভূমিকম্পেই আন্দুলেকের সৃষ্টি হয়েছিল। তবে, বড় ভূমিকম্প হওয়ার জন্য যে শক্তির প্রয়োজন তা হতে আরও দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন আছে।’

 

মাকসুদ কামাল বলেন, ‘এখনই বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা করি না; যদিও বাংলাদেশে বেশ কিছু সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক ফাটল আছে। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমে, দক্ষিণ পশ্চিমে এবং পশ্চিমাঞ্চলে এ রকম বেশ কিছু ফাটল আছে। এর যেকোনোটিই যেকোনও সময় সক্রিয় হওয়ার অবস্থা রয়েছে।’

 

ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে তিনি বলেন, ‘প্রথম কাজ হচ্ছে, বিল্ডিং কোড মেনে ভূমিকম্পনরোধী এমন বিল্ডিং তৈরি করা, যেটি হবে কম্পন সহনীয়। উদ্ধার ও অনুসন্ধান করার জন্য যেসব সংস্থা আছে, তাদের দক্ষতা বাড়িয়ে আরও শক্তিশালী করতে হবে। একইসঙ্গে বড় ভূমিকম্প হলে সাধারণ মানুষ কী করবে সে জন্য সচেতনতা বাড়াতে বড় বড় ভবন ও প্রতিটি ওয়ার্ডে মহড়া হওয়া দরকার।’

 

আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, শনিবার বেলা দুইটা পর্যন্ত পাঁচ বার কম্পন অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে চারটি হলো ৪.১, ৪, ৩ ও ২.৮ মাত্রার।

 

ঢাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেটেরই জৈন্তা এলাকায়। জৈন্তা এলাকার ডাউকি ফল্টেই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল। ডাউকি ফল্ট পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় তিনশ’ কিলোমিটার বিস্তৃত এবং এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই পলিমাটি দিয়ে ঢাকা।’

 

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অবস্থান ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মা তিনটি গতিশীল প্লেটের সংযোগস্থলে। এই সংযোগস্থলে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের শক্তি জমা হয়েছে। যে শক্তি সঞ্চিত হয়ে আছে তাতে আট মাত্রার পর্যন্ত ভূমিকম্প হতে পারে, যদি একবারে হয়। হলে একবারেও হতে পারে আবার ভেঙে ভেঙে বা দফায় দফায়ও হতে পারে। এতে মাত্রা কমে আসতে পারে। কিন্তু কোন মাত্রার হবে, এটা আগে থেকে অনুধাবন সম্ভব না। তাই আমাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রস্তুতি নিতে হবে। মহড়ার ব্যবস্থা এবং মানুষকে সচেতন করা জরুরি।’

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর