বিদায়ের বছর পার : মানব হৃদয়ে অমর জনতার কামরান

প্রকাশিত: ৪:৫০ অপরাহ্ণ, জুন ১৫, ২০২১

বিদায়ের বছর পার : মানব হৃদয়ে অমর জনতার কামরান

আব্দুল খালিক
অশ্রুসিক্ত নয়নে শেষ বিদায়ের এক বছর গত হয়েছে। ২০২০ সালের এই দিনে (১৫ জুন) করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র, জননন্দিত নেতা বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় প্রিয় নেতাকে শেষ বিদায় জানায় সিলেটবাসী। এরপর থেকেই সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গণে নেমে আসে শোকের ছায়া, হৃদয়ে রক্তকরণ নিয়ে একটি বছর অতিবাহিত করেন কামরান সতীর্থরা। অবশেষে মঙ্গলবার কামরানের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে আবারও তাকে স্মরণ করেন কামরানের প্রাণের সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। সেই সাথে সিলেটের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ স্বজন-শুভাকাক্সিক্ষরা তাকে স্মরণ করেন।

 

ইতোমধ্যে কামরানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মহানগর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকেও দোয়া মাহফিল ও শিরণী বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত সপ্তাহ থেকে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো সংগঠন কামরানের রূহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে আসছে।

 

এদিকে চলে যাওয়ার এক বছর অতিক্রান্ত হলেও এখনও মানব হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন জনতার কামরান। থাকবেন যুগ যুগ পর্যন্ত। কামরানকে ভুলে যাওয়া এতটা সহজ বলেও মনে হয় না। নগরের প্রতিটি অন্তরায় লেপ্টে আছে কামরানের স্মৃতি। কামরানকে জনতার মাঝে অমর করে রাখতে নগর ভবনের সামনের চত্বরকে কামরান চত্বর হিসেবে নাম করণ করা হয়েছে। এবং সেটি সম্ভব হয়েছে কেবল জনতার ভালোবাসার ফলশ্রুতিতে। নয়তো এটি কামরান চত্বর না হয়ে অন্য কোনো নামে বহাল থাকতো। কিন্তু জনতার আন্দোলনে প্রিয় নেতার স্মৃতি চিহ্নটি আজ উন্মুক্ত। বড় ফ্রেমে বাঁধানো কামরানের ছবিখানা আজও শোভা পায় সেই চত্বরে।

 

শুধু এই একটি মাত্র চত্বর নয়, নগরের প্রতিটি অলি-গলিতে রয়েছে কামরানের স্মৃতি চিহ্ন। বিভিন্ন রাস্তার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের উদ্বোধনেও রয়েছে তার নাম ফলক। সুতরাং, জনতার কামরান যুগ যুগ ধরে মানব হৃদয়ে অমর হয়েই থাকবেন।

 

এক নজরে বদর উদ্দিন আহমদ কামরান :-
বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি সিলেট নগরের ছড়ারপাড়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম বশির উদ্দিন আহমেদ ও মাতার নাম নুরুননেসা বেগম লাকলেন। তিনি দুর্গা কুমার পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। এরপর ১৯৭১ সালে ভর্তি হন সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে মাধ্যমিকের পাঠ চুকিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য মুরারি চাঁদ কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৭৩ সালে এখান থেকে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৭৬ সালে তিনি মদন মোহন কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

 

ছাত্র জীবন থেকেই নগরের বিভিন্ন উন্নয়ন নিয়ে ভাবতেন কামরান। সেই ভাবনা থেকেই উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় ১৯৭৩ সালে তিনি সিলেট পৌরসভায় ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেসময় তিনি ছিলেন পৌরসভার সর্বকনিষ্ঠ কমিশনার। পরবর্তী ধাপে আরও দুইবার তিনি ওয়ার্ড কমিশনার হিসেবে নির্বাচিত হন। সব মিলিয়ে কামরান তিন তিনবারের কমিশনার ছিলেন। এরপর ১৯৯৫ সালে তিনি সিলেট পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
শুধুমাত্র একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবেই কামরানের জনপ্রিয়তা ছিল না। রাজনৈতিক অঙ্গণেও জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন কামরান। ১৯৮৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগের সিলেট নগর শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০০২ সালে সিলেট সিটি করপোরেশনে উন্নীত হলে তিনি ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন।

 

২০০৩ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন কামরান। তখন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন মুহাম্মদ আবদুল হক। পরাজিত প্রার্থী থেকে ২০ হাজারের বেশি ভোটে কামরান বিজয়ী হন।

 

২০০৫ সালে, একটি টেনিস কোর্টের উদ্বোধন করতে গেলে, হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশ সদস্যরা তাকে হত্যার প্রয়াসে তাঁর দিকে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে হরকত উল জিহাদ-আল-ইসলামী বাংলাদেশের ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে তাকে হত্যার চেষ্টা করার অভিযোগ আনা হয়েছিল।

 

২০০৭ সালে তিনি সিলেট কিচেন মার্কেট ঘুষ মামলায় গ্রেপ্তার হন। মামলায় জামিন পেলেও কামরানকে জরুরি ক্ষমতা বিধিমালার দায়ের করা অন্য মামলায় আটক করা হয়।

 

২০০৮ সালে কারাবন্দি থাকা অবস্থায়, ২০০৮ সালের মেয়র নির্বাচনের প্রতিযোগিতা করার জন্য তিনি তার মনোনয়ন ফরম জমা দেন ও মেয়র হিসেবে দ্বিতীয় বার নির্বাচনে জয় লাভ করেন। ভোটাররা তাকে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দ্বারা অন্যায়ভাবে আটক হিসাবে দেখেছিলেন। নির্বাচনে তিনি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ৮৩ হাজার বেশি ভোট পেয়েছিলেন। ২০০৮ সালের ১৭ আগস্ট তাকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়। ২০০৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান।

 

কামরান ২০১৩ ও ২০১৮ সালের মেয়র নির্বাচনে আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে পরাজিত হন।

 

২০০২ সালের সম্মেলনে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর ২০০৫ এবং ২০১১ সালের সম্মেলনেও পুনরায় নির্বাচিত হয়ে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন।

 

বৈবাহিক জীবনে বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ছিলেন একজন সফল স্বামী ও সফল পিতা। তাঁর সহধর্মীনির নাম আসমা কামরান। কামরান-আসমা দম্পতির দুই পুত্র এবং এক কন্যা রয়েছেন। তারা হলেন- আরমান, আশা ও আদনান। সন্তানদের কাছে কামরান একজন সফল পিতা হিসেবেই স্বীকৃতি পেয়েছেন।

 

উল্লেখ্য, বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান ও তার স্ত্রী আসমা ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাজ্য ভ্রমণে যান ও ৫ মার্চ যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ৫ জুন কোভিড-১৯ পরীক্ষায় তার শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এরপর তাঁকে সিলেট শামসুদ্দিন আহমেদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার অবস্থার অবনতি হলে, ২০২০ সালের জুনে তাকে বিমান অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ১৫ জুন ২০২০ সালে রাত তিনটায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধিন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। পরে তাকে মানিকপীর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

  •  

সর্বশেষ ২৪ খবর