বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত বিশেষজ্ঞদের
মাত্র এক মিনিটের মাথায় দুইবার কেঁপে ওঠে সিলেট

প্রকাশিত: ৮:৫৪ অপরাহ্ণ, জুন ৮, ২০২১

<span style='color:#077D05;font-size:19px;'>বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত বিশেষজ্ঞদের</span> <br/> মাত্র এক মিনিটের মাথায় দুইবার কেঁপে ওঠে সিলেট

আব্দুল খালিক
সিলেটে বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে এমন ইঙ্গিত ইতোপূর্বে দিয়ে রেখেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছিলেন, সিলেট হচ্ছে ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল। ভূতাত্ত্বিকভাবে এই অঞ্চলটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বড় ধরনের ভূমিকম্পের ফলে সিলেটে অনেক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ছোট ছোট ভূমিকম্পগুলো তারই বার্তা বহন করছে।

 

গত ৩০ মে শনিবার সিলেটে দফায় দফায় ভূমিকম্পের পরদিন ৩১ মে রবিবার আবারও ভূকম্পন অনুভূত হলে তারা এমন মতামত দেন। সাত দিনের ব্যবধানে সোমবার সন্ধ্যায় মাত্র ১ মিনিটের মাথায় দুইবার ভূকম্পন হওয়াতে সেই আতঙ্ক আরও বিস্তৃত হয়। গুরুত্বপায় বিশেষজ্ঞদের মতামত। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ২৯ মিনিটে পথমে মৃদু ভূকম্পন হলেও ৬টা ৩১ মিনিটের দিকে বড় ধরনের ঝাকুনিতে কেঁপে ওঠে সিলেট। আতঙ্কিত লোকজন মার্কেট, শপিংমল, বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে হুড়োহুড়ি করে নিচে নামতে দেখা যায়। এসময় এক অজানায় শঙ্কায় ভোগেন তারা। তবে ভূমিকম্পে কোন ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। সোমবারের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের কাদিপুর বা আশপাশের এলাকায় বলে জানা গেছে।

 

ঢাকা আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মমিনুল ইসলাম জানান, সোমবার সন্ধ্যায় সিলেটে ভূমিকম্প হয়েছে। এর স্থায়িত্ব ছিল ৬টা ২৯ মিনিট ৩১ সেকেন্ড। আর মাত্রা ছিলো ৩ দশমিক ৮।

 

দুইবার ঝাঁকুনি অনুভূত হয়েছে দাবি করলে তিনি বলেন, দুইবার ঝাঁকুনি অনুভব হলেও এটি একই ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি হিসেবেই ধরে নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এর উৎপত্তিস্থল ঢাকা থেকে ১৮৮ কিলোমিটার উত্তর পূর্ব দিকে। সে হিসেবে এটি সিলেট সেন্ট্রালেই ধরে নেওয়া যায়।

 

বিষয়টি জানতে সিলেট আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সন্ধ্যায় সিলেটে অনুভূত হওয়া ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সিলেট আবহাওয়া অফিস থেকে ১০ কিলোমিটার দূরত্বে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নে।

 

এদিকে সিলেটে ঘন ঘন ভূমিকম্প হওয়াতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশ না হলেও বাংলাদেশে সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক ফাটলের কারণে বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে বলে তারা অভিমত ব্যক্ত করেন।

 

অপর দিকে ভূমিকম্পের ক্ষয়-ক্ষতি কমাতে তাৎক্ষণিকভাবে সিলেটের ২২টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, মার্কেট ও দোকান চিহ্নিত করে সিসিক। পরে ৬টি মার্কেট, ১টি ভবন ও ১ দোকানকে ১০ দিন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়াও ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা সিলেটে ভূমিকম্পের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী করণীয় নিয়ে কাজ শুরু করে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। এর মধ্যে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনাও নেওয়া হয় বলে জানায় সিসিক সূত্র। গত ১ জুন মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় ভূমিকম্প পূর্ববর্তী ও পরবর্তীতে সিসিকের করণীয় কী হতে পারে কিংবা কিভাবে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায় সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সাথে সভায় বসেন সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।

 

বিষয়টি নিশ্চিত করে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ড. মাসুদ কামাল, বিশেষজ্ঞ ড. আনসারি, বিশেষজ্ঞ ড. জাহাঙ্গীরসহ সিলেটে যারা ভূমিকম্প নিয়ে কাজ করেন তাদের সাথে বৈঠক করা হয়েছে। কারণ তারা সকলেই দীর্ঘদিন বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। এজন্য আমরা তাদের পরামর্শ নিয়েই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

 

সভার গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শগুলোর মধ্যে রয়েছে- ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ ও ঝুঁকিমুক্ত করার উদ্যোগে নেয়া; উদ্ধারকর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত করা; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভূমিকম্প হলে করণীয় বিষয়ে নিয়মিত মহড়া আয়োজন; ভূমিকম্পে করণীয় বিষয়ে প্রচারণা অব্যাহত রাখা; ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী ভবন নির্মাণ হচ্ছে কি না তা তদারকী করা ও সিলেটে ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি।

 

ভূমিকম্পের আশঙ্কায় সিলেট সিটি করপোরেশন দুর্যোগ মোকাবেলা এবং ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসকরণের লক্ষ্যে সভায় বিশেষজ্ঞ বক্তা হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল, চুয়েটের সাবেক ভিসি ও ইউএসটিসির উপাচার্য্য অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম, জিওটেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞ, বুয়েটের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমদ আনসারী এবং শাবিপ্রবির অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম।

 

সভায় ভার্চুয়ালিভাবে অংশ নেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন এমপি। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে যুক্তছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ।

 

সভায় প্রধান অতিথি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন এমপি বলেন, নাগরিকদের সচেতন করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করতে হবে। নাগরিকরা যাতে আতঙ্কিত না হয় সেজন্য প্রচার প্রচারণা চালাতে হবে।

 

ভূমিকম্পে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তালিকায় সিলেট আছে উল্লেখ্য করে মন্ত্রী বলেন, সিলেট এজন্য আগে টিনের এক তলা বাড়ি বেশি ছিল। এখন প্রয়োজনে বহুতল ভবন হচ্ছে, ঝুঁকিও বাড়ছে। তবে, এবারের ভূমিকম্প পরিস্থিতিতে মন্ত্রণালয়ের দ্রুত উদ্যোগকে স্বাগত জানান তিনি। প্রাকৃতিক এই অনিশ্চিত ঝুঁকি মোকাবেলা ও ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে সরকার সোচ্চার রয়েছে বলেও জানান তিনি।

 

বিশেষ অতিথি হিসেবে যুক্ত ছিলেন- স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আমহদ বলেন, সিলেট ভূমিকম্পের রেড জোনে রয়েছে। তাই এখানকার প্রস্তুতিটাও নিতে হবে সেদিক বিবেচানায় রেখে। বিশেষজ্ঞদের মতামত–এ অঞ্চলে বড় ধরণের ভূমিকম্প হতে পারে। এজন্য আগাম প্রস্তুতিমূলক এই বিশেষজ্ঞ মতামত সভা অত্যন্ত সময়োপযোগি।
তিনি বলেন, ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ মোকাবেলায় এ অঞ্চলে উদ্ধারকর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত করতে হবে। সিলেটে ফায়ার সাভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক কার্যালয় করতে হবে। যেখানে উদ্ধার কাজের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি–সরঞ্জাম মওজুদ থাকবে। এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভূমিকম্প হলে করণীয় বিষয়ে নিয়মিত মহড়া আয়োজন, ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী ভবন নির্মাণ হচ্ছে কি না তা তদারকী বাড়ানোর জন্য সিসিকের প্রতি আহবান জানান তিনি।

 

তিনি বলেন, সিলেট শহরে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। সার্ফেজ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নির্ভর পানি চাহিদা পূরণের দিকে যেতে হবে সিলেট সিটি করপোরেশনকে।

 

ভূমিকম্পের আশংকায় সিলেট সিটি করপোরেশন দুর্যোগ মোকাবেলা এবং ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসকরণের লক্ষ্যে সভায় বিশেষজ্ঞ বক্তা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রণয়ন ও হালনাগাদ অত্যান্ত জরুরী। এছাড়া এ অঞ্চলে বড় ধরণের ভূমিকম্প হলে দুর্যোগকবলিত মানুষের উদ্ধারে বেশি নজর দিতে হবে। সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের রানওয়ের সক্ষমতা এবং দুর্যোগে ত্রাণ কিংবা চিকিৎসা নিয়ে আসা বিমান/হেলিকপ্টার কতোটি নামতে পারবে সে তথ্যও পরিকল্পনায় রাখতে হবে।

 

চুয়েটের সাবেক ভিসি ও ইউএসটিসির উপাচার্য্য অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ধারণা করা হয় ডাউকি চ্যুতিতে কম্পন হলে সেটি ৮ মাত্রার হতে পারে। সেক্ষেত্রে বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতির আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে এখনই উদ্যোগ নিলে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য সিলেট সিটি করপোরেশনসহ সকল দপ্তর ও শাখাকে জাতিয় দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রণীত গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে নগরের সকল ভবন এসেসমেন্ট করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করতে হবে। সে অনুযায়ী ভবনগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

 

বুয়েটের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমদ আনসারী বলেন, এখনও সময় আছে। চাইলে ৬ মাসের মধ্যেই সিলেট নগরের সকল ভবন এসেসমেন্ট করে ফেলা সম্ভব। ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে হলে নদগরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন কমাতে হবে-এর কোন বিকল্প নেই।

 

বিশেষজ্ঞ বক্তা শাবিপ্রবি’র অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম সভার শুরুতে সিলেট নগরে ভূমিকম্প চ্যুতি ও এই শহরের পানির স্থর নেমে যাওয়ার উপর আলোচনা ও মতামত ব্যক্ত করেন।

 

ভার্চুয়াল সভায় যুক্ত থেকে আলোচনায় অংশ নেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খলিলুর রহমান, সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার নিশারুল আরিফ ও সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম।
অন্যান্যের মধ্যে সভা উপস্থিত ছিলেন- সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. নূর আজিজুর রহমান, সচিব ফাহিমা ইয়াসমিন, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম, ফায়ার সার্ভিস সিলেটের ভারপ্রাপ্ত উপ পরিচালক আনিসুর রহমান, সিসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) মো. আব্দুল আজিজ, নির্বাহী প্রকৌশলী শামসুল হক পাঠোয়ারী, নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সোবহান, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. হানিফুর রহমান, সহকারী প্রকৌশলী জয়দেব বিশ্বাস, মেয়রের সহকারী একান্ত সচিব সোহেল আহমদ, জনসংযোগ কর্মকর্তা আব্দুল আলিম শাহ প্রমুখ।

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর