ঢাকা ৩রা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১:৩৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ২, ২০২০
সুষমা সুলতানা রুহি : শৈশবেই বাইকেল চালানো শিখি। গ্রামের বাড়ি ওসমানীনগর থানার তাজপুরের কলেজ বাড়ি ও কলেজ ক্যাম্পাসেই আমি সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেরাতাম। ৮ম শ্রেণিতে অধ্যায়নকালে গ্রামীণ জনপদে আমিই প্রথম মোটরসাইকেল চালিয়ে স্কুলে গিয়েছি।
সংসার জীবনে প্রবেশের অনেক পরে শুরু হয় শহুরে জীবন। এই শহুরে জীবনের একটা সময়ে সিলেট সাইক্লিং কমিউনিটির সাথে জয়েন করি। এখন প্রতিদিনই চেষ্টা করি ভোরে সাইক্লিং কমিউনিটির সাথে রাইডে বের হতে। সাইক্লিং এ আসার কারণে যানজট বিহীন স্নিগ্ধ সকালে সিলেট শহরকে সে এক মায়াবী রুপে দেখতে পারি। প্রকৃতিকেও খুব কাছে থেকে আলিঙ্গন করতে পারি। সবকিছু মিলিয়ে অসম্ভব ভাল লাগায় দিনটি শুরু করি।
এ গ্রুপের নিয়ম অনুযায়ী একেক দিন একেক দিকে রাইডে যাওয়া হয়। কোনো দিন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে, কোনোদিন নগরীর টিলাগড়ের দিকে, কোনো দিন এয়াপোর্টের দিকে ইত্যাদি। প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটারের মতো রাইড করা হয়।
একদিন গিযেছিলাম এয়ারপোর্টের দিকে। ওইদিনের রাইড গ্রুপে শুধু আমিই একমাত্র নারী ছিলাম। ছেলেদের মধ্যে আমার ছোট ছেলে আদীপ্ত ও তার বন্ধুসহ সাইক্লিং গ্রুপের সিনিয়র বেশ কয়েকজন ছিলেন। আমি সাইক্লিংয়ে আসার পর থেকে সবসময় কান খোলা রাখার চেষ্টা করি। একটিই কারণ, তাহলো পথচারীদের মন্তব্য শোনা। কিন্তু এর আগের কয়েক দিনের মধ্যে কোনো নেগেটিভ মন্তব্য আমার কানে আসেনি। অনেক আপুরা কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, অনেকে নেগেটিভ মন্তব্য শুনে থাকেন। যেমন কেউ বলতে শুনেছেন একজন হুজুর নাকি আপুকে সাইক্লিং করতে দেখে বলেছে * “আল্লাহ সিলেটে এ কী শুরু হইলো” ( আল্লাহ সিলেটে কী শুরু হয়েছে)। আরেকজন আপু বলেছেন তিনি শুনেছেন- “দেখো–দেখো, আল্লাহ আমরারে আরো খততা দেখাইবারেবা” (আল্লাহ আমাদেরকে আরো কত কী দেখাইবা?) ইত্যাদি। কিন্তু আমি নিজের কানে এতোদিন কোনো মন্ত্য শুনিনি। ওইদিন শুললাম । তা আমাকেই উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। যেহেতু গ্রুপে মেয়ে হিসেবে একাই ছিলাম আমি। মন্তব্যটি হলো- “জীবনেও ই-মেয়ের বিয়া অইতোনায়” :(কোনোদিন এই মেয়ের বিয়ে হবে না)।
পথচারীদের মন্তব্য শোনার কারণও আছে। ১৯৮৮- ১৯৮৯ সালে আমার বাবা বাই সাইকেল, স্কুটার বা গাড়ি চালানো শিখিয়েছিলেন। প্রয়োজনে এ বাহনগুলো নিয়ে রাস্তায় বের হতাম। অনেক মন্তব্য শুনেছি সেসময়। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে ওইসব মন্তব্যের পরিবর্তন হয়েছে কীনা তা জানার আগ্রহ জাগে। নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে সেটাও যাচাই করে নেয়া।
আমি আমার পর্যবেক্ষণে যা পেয়েছি তাহলো অনেক পরিবর্তন এসেছে। কারণ সেই ১৯৮৮-৮৯ সালে আমি বকা (কটু কথা) শুনেছি। অনেক খারাপ খারাপ মন্ত্যব্য শুনেছি। অনেকের চোখেও ছিলাম খুবই বিতর্কিত।
সময়ের ব্যবধানে এখন অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে আগের চাইতে এখনকার মন্তব্য অনেকটাই শালীনতার ভিতরে।
পুরুষতন্ত্র, ধর্মীয় কুসংস্কার বা মৌলবাদ ডিঙিয়ে অনেকে এগিয়ে গেছে নারী সমাজ। অনেকে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন করে আমাদেরকে বর্তমান অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত, প্রীতিলতা, ইলামিত্র, নূরজাহান বেগম, সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমাম প্রমুখ।
তাঁরা নারী অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য আমৃত্যু লড়াই করেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন নিজ নিজ অবস্থাান ও মতাদর্শ থেকে। সতীদাহ প্রথা থেকে আজ পর্যন্ত নারীদের দিকে তাকালে আমরা কী দেখি বা কী উপলব্ধি করি? চোঁখ বুজে বলা যায়, আমরা অনেক কিছুই অর্জন করতে পেরেছি। হিমালয়ের চূড়া পর্যন্ত জয় করতে পেরেছেন সেই অবহেলিত নারী। এ বছর ক্রিকেটে নারীরা এশিয়া কাপ জয় করেছেন।
সত্যি বলতে কী বাংলাদেশে সম্পূর্ণ রূপে নারীবান্ধব পরিবেশ এখনো সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারীদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে আমরা অনেটাই সুফল ভোগ করতে পারছি। মানবতার মানসকন্যা শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আরো কৃতজ্ঞতা ও স্যালুট জানাই সেই সকল নারীদের, যারা অনেক বাঁধা বিপত্তিকে জয় করে অদম্য প্রাণশক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছেন।
লেখক: সদস্য, সিলেট জেলা পরিষদ।
সম্পাদক : জে.এ কাজল খান
স্বত্ত্ব: দৈনিক বিজয়ের কণ্ঠ (প্রিন্ট ভার্সন)
০১৭১৮৩২৩২৩৯
Design and developed by syltech