ফেসবুকিংয়ের যুগে আত্মপ্রেম!

প্রকাশিত: ২:০৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০১৯

ফেসবুকিংয়ের যুগে আত্মপ্রেম!
মোরশেদুল আলম মহব্বত :
.আমরা একবিংশ শতাব্দীর অধিবাসী হলেও আমরা অনেকেই ‘নার্সিসিজম’ (আত্মপ্রেম) শব্দ বা ধারণার সাথে খুব একটা পরিচিত নয়। তবে এটাও সত্যি যে আমাদের তরুণ সমাজ এই ধারণার সাথে পরিচিত না হলেও তারা এই ধারণা দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। নার্সিসিজম শব্দ এবং ধারণার উৎস প্রাচীন গ্রীসে হলেও এটি আর অপ্রচলিত কোনো শব্দ না; বরং এটি আমাদের তরুণ প্রজন্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।
নার্সিসিজম বলতে নিজের অত্যাধিক প্রশংসা ও নিজের সৌন্দর্যের প্রতি খুব বেশি পরিমাণে আসক্ত (মুগ্ধ) হওয়ার অভ্যাসকে বোঝায়। যুক্তরাষ্ট্রে বেশকিছু নাগরিকের উপর পরিচালিত এক গবেষণার পর একদল মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সম্প্রতি অভিমত প্রকাশ করেছেন যে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলো নার্সিসিজম চর্চা করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আমাদের যুব সমাজ-এর ব্যতিক্রম নয় এবং আমাদের তরুণ সমাজের বেশির ভাগই ফেসবুকিং করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপচয় করে। এমন মনোভাবের প্রধান কারণ হলো তারা ‘নার্সিসিসটিক ডিসওর্ডার’ (যাকে সহজ ভাষায় এক ধরনের ব্যাধি বলা যেতে পারে) নামক একটি আধুনিক যুগীয় ব্যাধির দ্বারা প্রভাবিত এবং আক্রান্ত। গ্রিক পৌরাণিক অনুসারে, প্রাচীন গ্রিসে নার্সিসাস নামে একব্যক্তি ছিল। সে এতটাই সুদর্শন ছিল যে পরীরাও তার প্রেমে পড়ে যায় কিন্তু পরীদের প্রেম প্রস্তাব সে প্রত্যাখান করেছিল। পরীদের তার জন্য এমন উন্মাদনা নার্সিসাসকে চরমভাবে প্রভাবিত করে এবং সে নিজেই নিজের রূপের প্রেমে পড়ে যায়।
 ‘গ্রিক পৌরাণিক অনুসারে, প্রাচীন গ্রিসে নার্সিসাস নামে একব্যক্তি ছিল। সে এতটাই সুদর্শন ছিল যে পরীরাও তার প্রেমে পড়ে যায় কিন্তু পরীদের প্রেম প্রস্তাব সে প্রত্যাখান করেছিল। পরীদের তার জন্য এমন উন্মাদনা নার্সিসাসকে চরমভাবে প্রভাবিত করে এবং সে নিজেই নিজের রূপের প্রেমে পড়ে যায়।’
একবার নার্সিসাস পানিতে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায় এবং নিজের রূপের প্রতি ভালবাসা কাটিয়ে উঠতে না পারার কারণে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকে। পৌরাণিক কাহিনীতে বলা আছে যে নার্সিসাস নিজের প্রতিচ্ছবি দেখা অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে এবং সেখান থেকে একটি ফুল গাছেরও উৎপত্তি হয়। মূলত সেখান থেকেই ‘নার্সিসিজমের’ ধারণাগত বিকাশ ঘটে এবং পরবর্তীতে ইতিহাসে স্বীকৃতি লাভ করে। প্রাচীন গ্রীসে এই ব্যাধি বা সমস্যা ‘হাবরিস’ নামে পরিচিত ছিল এবং মজার ব্যাপার হলেও সত্যি যে এই ব্যাধিকে আধুনিক যুগে আসারপর মনোবিজ্ঞানীরা একটি মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করতে সফল হয়েছে।
ফেসবুক একটি খুবই জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেখানে মানুষের কার্যকলাপ এখন আর শুধু তথ্য ও ভাব আদান প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি তরুণ সমাজের জন্য নার্সিসিজমের বৈশিষ্ট্যগুলোপ্রদর্শনের জন্য খুব নিরাপদ ও নিখুঁত একটি সাইটে পরিণত হয়েছে। তরুণ সমাজের অনেকেই (বিশেষত মেয়েরা) এখন ফেসবুকে ছবি আপলোড এবং ট্যাগ করা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করে। এছাড়া তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ছবি পোস্ট করাকে একটি আকর্ষণীয় কাজ মনে করে এবং এজন্য ছবি তোলার সময় মোবাইলে বিভিন্ন রকম ফিল্টার ব্যবহার করে।
অবাক করার বিষয় হলো এদের মধ্যে অনেকের জন্যই ফেসবুকে ছবি পোস্ট করা ও অন্যের ছবিতে মন্তব্য করাটা তাদের মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তদুপরি তারা এ জাতীয় কার্যকলাপকে সময়ের অপচয় হিসাবে বিবেচনা করে না। আমরা প্রায়ই দেখি যে যখনই কেউ ফেসবুকে কোনো ছবি আপলোড করে তখন সবাই প্রচুর মন্তব্য করে। কখনও কখনও সেসব মন্তব্য শালিনতার সীমা অতিক্রম করে। অনেকেই অবমাননাকর ও অশোভন মন্তব্য করে (বিশেষত মেয়েদের ছবির ক্ষেত্রে)। এমন মন্তব্য মেয়েদেরকে বস্তু হিসেবে মূল্যায়নের আকাঙ্খা থেকে আবির্ভূত হয়।
মার্টিন বুবার নামে এক অস্ট্রিয়ান দার্শনিক ১৯২৩ সালে ‘ইচ অ্যান্ড ডু’ (আমি এবং আপনি) শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। যেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে আমাদেরকে ‘নার্সিসিজম’ প্রায়শই এমনভাবে প্রভাবিত করে যে আমরা অন্যদেরকে নিজেদের সমকক্ষ না ভেবে বরং বস্তুরূপে বিবেচনা করি। সনামধন্য দার্শনিক ও লেখক টমাস ডেভিড তাঁর ‘নার্সিসিজম :বিহাইন্ড দ্য মাস্ক’ বইয়ে নার্সিসিজমের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য সনাক্ত করেছেন। সেসব বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো- উদ্ভট অঙ্গভঙ্গি ব্যবহার করা, এমন ব্যক্তিদের গ্রাহ্য করা যারা তাদের প্রশংসা করে এবং যারা তাদের প্রশংসা করে না তাদেরকে ঘৃণা করা, অন্যদের চেয়েনিজেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে ভান করা, নিজের অর্জনগুলোর অতিরঞ্জিতকরণ, নিজেকে সকল বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা এবং অন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবী ও নিজের চারপাশকে দেখার অক্ষমতা।
উদাহরণস্বরূপ, সেদিন দেখলাম আমার এক ফেসবুক বন্ধু তার প্রোফাইলেতার এক আত্মীয়ের জানাযায় অংশগ্রহণ করেছে এমন একটি ছবি পোস্ট দিয়েছে। ছবিতে তাকে বেশ উৎফুল্ল মনে হচ্ছে। কিন্তু এমনটা হওয়ার কথা না যদি আমরা সেই অনুষ্ঠানের গাম্ভীর্য বা গুরুত্ব বিবেচনায় নেই। যাই হোক তারপরেও সে ছবিটি তুলেছে এবং ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছে। আশ্চর্যজনক হলো সেই ছবির নিচে অনেকেই এমন মন্তব্য করেছে (যেমন ধরুন দারুণ লাগছে) যা মোটেও কাম্য না। এই উদাহরণ থেকে এটা স্পষ্ট যে আমরা ফেসবুকে এক ধরনের কল্পনার জগতে বসবাস করি এবং আমরা নির্লজ্জের মতো কাজকর্ম করি। অনেকেই সমবেদনা জানানোর পরিবর্তে দেখতে কেমন লাগছে সেটা নিয়ে মন্তব্য করছিলো। এমন কার্যকলাপ থেকে এটা বুঝতে কষ্ট হয় না যে অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারীরা অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিচার করা বন্ধ করে দিয়েছে।
আমেরিকান দার্শনিক হচকিসের মতে এমন নির্লজ্জতাও নার্সিসিজমের লক্ষণ। নার্সিসিজমে ভুগছে এমন মানুষের লজ্জা অনেক কমে যায় এবং বর্তমানে আমাদের চারপাশে এমন মানুষের অভাব নেই (বিশেষ করেফেসবুকে) যাদের চক্ষুলজ্জা নেই বললেই চলে। প্রকৃতপক্ষে নার্সিসিজমের এমন নির্লজ্জ প্রদর্শন আমাদের যুবসমাজের জন্য মোটেও ভালো নয়। তবে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলাটা যদি আমাদের জন্য খুব গুরুত্ব বহন করে তাহলে আমর সর্বোচ্চ নার্সিসিজমের ভালো দিকগুলো (হেলদি নার্সিসিজম) অনুশীলন করতে পারি।
অস্ট্রিয়ান মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড ১৯১৪ সালে ‘নার্সিসিজম :অ্যান ইনট্রোডাকশন’ নামক প্রবন্ধে হেলদি নার্সিসিজমকে সংজ্ঞায়িত করেন। তিনি বলেন যে ‘হেলদি নার্সিসিজম’ সকল ব্যক্তিরমধ্যে বিদ্যমান থাকতে পারে এবং এমন ভাবনা একজন মানুষের স্বাভাবিক বিকাশের অংশ হতে পারে। যেমন- সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার ভালোবাসা এবং তাদের মনোভাবকে ‘হেলদি নার্সিসিজম’ হিসাবে মূল্যায়ন করাযেতে পারে।
সাধারণত পিতা-মাতারা নিজেরা যে উচ্চতায় কখনো পৌঁছাতে পারেনি তারা সেই উচ্চতায় নিজেদের সন্তানকে দেখতে চায় এবং নিরপেক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় যে পিতা-মাতারা তাদের সন্তানের গুণাবলিগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত মূল্যায়ন করেন। এমন মনোভাব থাকাটা যুক্তিসঙ্গত এবং একে ‘হেলদি নার্সিসিজম’ বলে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম এমন হেলদি নার্সিসিজমের চর্চা করতে পারে। এমনটা করতে পারলে আমরা ফেসবুক এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে সবার কাছে আরো গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারবো।
লেখক : সাংবাদিক।

সর্বশেষ ২৪ খবর