বিশ্ব যুব দিবস : কর্মঠ যুবসমাজ উন্নয়নের অগ্রপথিক

প্রকাশিত: ৬:৫০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩০, ২০১৯

বিশ্ব যুব দিবস : কর্মঠ যুবসমাজ উন্নয়নের অগ্রপথিক

আফতাব চৌধুরী :  ১২ই আগষ্ট বিশ্ব যুব দিবস। জাতীয় যুব দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম দেশের সর্বত্রই বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে সরকারী ও বেসরকারীভাবে দিবসটি পালিত হচ্ছে। নিঃসন্দেহে যুবসমাজ প্রতিটি ভূখন্ডের প্রগতি, সাম্য আর সমাজ উন্নয়নের কান্ডারী। অশেষ উদ্যম, সৃজনশীলতা, কর্মশক্তি আর সৃষ্টিশীলতার মূর্তপ্রতীক যুবসমাজ, যারা গড়তে পারে সমাজ, রাষ্ট্র আর নিষ্কলুষ জাতিসত্তা। ১৯২০ সালের বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের দামামা, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে যুবক ও যুব মহিলারা তাদের সাহস, প্রত্যয় আর যোগ্যতা, দক্ষতার মাধ্যমে প্রমাণ করেছে দেশাত্মবোধের প্রতি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গীকার।
‘এ লভিনু সঙ্গ তব’ এর মতো যুবরাও সঙ্গত্যাগী হয়ে বয়োবৃদ্ধ হবে। কিন্তু তাদের অপরিসীম শক্তি, গতি আর অগাধ আশার দুর্বার সকল কর্মযজ্ঞ কখনো কালের গর্ভে বিলীন হবে না। কারণ ক্লান্তিহীন সাধনা আর উৎসাহের বলে বলীয়ান হয়ে যুবরাই পরাভব মানায়-মৃত্যুর দর্পকে। তাইতো যুব কথা ইয়থ মানে ঐক্য, তারুণ্য, কৌশল আর কর্মঠ সংঘবদ্ধতার যুক্তসমষ্টি। বিশ্বব্যাপী তারুণ্যের জয়জয়কারে যুবদের বিভাজন সে রকমই।
১৯৭৬ সালে এবং তৎপরবর্তী সময়ে সংশোধিত জাতীয় যুব নীতিমালা অনুযায়ী দেশের ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী নাগরিকরা যুব হিসেবে বিবেচিত। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটানেও যুবদের বয়সের নিক্তিটা এমনই। তবে জাতিসংঘ এ বয়সটা সর্বোচ্চ ২৪/২৫ পর্যন্ত স্বীকৃতি দিয়েছে যা অনুসরিত হয় পাকিস্তানে। কিন্তু জাতিসংঘের ধারণাটি অবশ্য বিশ্বব্যাপী প্রেক্ষিতে বিবেচনায় নির্ধারিত। আমাদের দেশে সর্বশেষে গত বাজেটের রিপোর্ট অনুযায়ী যুবক ও যুব মহিলার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে চার কোটি। দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার কারণে এ দেশের যুবদের মধ্যে বেকারের সংখ্যা ধারণা মতে ৬০-৭০ শতাংশ। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় সোয়া এক কোটি। স্বনির্ভর, আত্মনির্ভরশীল, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, চাকুরে এমন যুবদের সংখ্যা মাত্র দেড় কোটি।
আশির দশকের পর থেকে বিশেষ করে সামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন দেশে উত্তরোত্তর শিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত, অশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়তে থাকায় যুবদের নিয়ে বেশ কিছু স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচী গৃহীত হয়। আজকের সমৃদ্ধ এবং সর্বজন পরিচিত যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, জাতীয় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় স্বাধীন এবং স্বতন্ত্রভাবে যুবদের নিয়ে দেশব্যাপী কর্মকান্ড প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগও ব্যাপকতা প্রায় আশির দশকে। জনসংখ্যার আধিক্য, দারিদ্র, খরা, বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ঘুর্ণিঝড়, মহামারীসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগের পাশাপাশি বেকারত্ব, রাজনৈতিক সন্ত্রাস, সামাজিক অস্থিরতা, হত্যা, খুন, ছিনতাই-রাহাজানি, ধর্ষণ, অপহরণ ও চুরি-ডাকাতির প্রকোপের সাথে স্বাভাবিকভাবে যুবদের নেতিবাচক সম্পৃক্ততা যখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠে তখন রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে অপাংক্তেয়ের মতো বিবেচিত হয়ে তারা দিকচিহ্নহীন বাহুল্য প্রতীকে পরিণত হয়।
অনস্বীকার্যভাবে দেশের অধিকাংশ অপরাধের সাথে অকর্মন্য যুবরা অবলীলায় জড়িয়ে যায়, ব্যবহৃত হয় সন্ত্রাস ও রাজনীতির গিনিপিক হিসেবে। নারী নিযাতন, ধর্ষণ, শিশু পাচার, অবৈধ নেশায় আসক্তিসহ সকল অসামাজিক কর্মযজ্ঞের মধ্যমনি হিসেবে চিহ্নিত হয় যুবরা। কিন্তু বিস্মৃত অতীতের উজ্জ্বল্য মনে করিয়ে দেয় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে শতকরা ৭৫ শতাংশ স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাই ছিল যুবকরা, যাদের মধ্যে অনেকেই আবার যুব মহিলা।
আগেই বলেছি আশির দশকটাই ছিল এদেশের যুবসমাজের জন্য একদিকে ক্রান্তিকাল অন্যদিকে শেকড় সন্ধানের মাইলফলক। ধন আর ধানে ভরে থাকা ফসলের মাঠ, স্বচ্ছ টলটলে পুকুর, দীঘি আর খাল-বিলের পানির অফুরন্ত মৎস্য ভান্ডার যুবসমাজকে স্বাবলম্বী হবার সাহস যোগায়। যথাসময়ে উদ্দীপ্ত করার এ কঠিন চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করে অগ্রস্থানীয় কিছু দেশী-বিদেশী বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা। অন্য কুসংস্কারের পুরো সমাজ যখন বদ্ধ বিভোর সেই প্রতিকূল সময়ে তৃণমূলে বিভিন্ন উন্নয়নমুখী কর্মকান্ডে যুবসমাজকে আগ্রহী করে সংঘটিত করার ক্ষেত্রে সরকার প্রদান করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আর্থিক সহায়তা, যা বেসরকারী ও সমাজ সেবামূলক সংস্থা সমূহকে তাদের লক্ষ্য প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট আনুকূল্যতা দেয়। এ ধারাবাহিকতায় গত বিশ বছরে আমাদের বর্তমান বাস্তবতা তুলনামূলকভাবে বিস্ফোরন্মুখ জন সমৃদ্ধির তুলনায় অকর্মন্য, কর্মঠের সংখ্যা, যারা সমাজ বিনির্মানে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। অর্থনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে যাদের দিক-নির্দেশনা গুরুযত্বপূর্ণ মাত্রা সংযোজন করছে। অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আজকের অধিকাংশ যুবকরা সম্পৃক্ত হয়েছে কম্পিউটার আর অতি আধূনিক বিজ্ঞান উৎকর্ষের বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায়। মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ। প্রতিযোগিতামূলক প্রথায় যোগ্যদের তুলে আনছে শীর্ষে। দেশে সর্বশেষ শিক্ষিতের হার অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক-যা বেকারত্ব দূরীকরণে খুব একটা প্রভাব না ফেললেও শিক্ষিত যুবকদের সদগতির জন্য ইতিবাচক। শিক্ষাঙ্গনে থাকাবস্থায় ইচ্ছা-অনিচ্ছার রাজনীতির স্পর্শ ব্যতিরেকে পরবর্তীতে পার্টটাইম, ফুল-টাইম জব, ক্ষুদ্র ব্যবসা, ডেইরী-পোলট্রি, টেক্সী-মেক্সী, মিনিবাস-কোস্টার চালানোর পাশাপাশি কোচিং টিউটর কিংবা টিউশনিতে পর্যন্ত নিয়োজিত হতে সংশয় নেই কারো। এটা দারিদ্র্যের কষাঘাতে পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধের পাশাপাশি জীবনের তাগিদ আর মেধার সর্বোচ্চ প্রকাশকেই স্পষ্ট করে, যদিও কর্মসংস্থানের অভাবে যুবকরা যতটা না কর্মহীন তারচেয়ে বেশি মনস্তাতিক হীনমন্যতায় আড়ষ্ট। দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণের অভাবই এর মূলে দায়ী। আগ্রহী কর্মঠ যুবকরা আর্থিক ও কারিগরী সাহায্য সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত। প্রলঞ্চিত কর্মহীনতা এক সময় বলিষ্ঠ হাতকেও অসাড় অকর্মন্য বোঝায় পরিণত করে। তাই বছর বছর বেড়ে যাওয়া শিক্ষিত-অশিক্ষিত যুবদের কর্মমুখী ও কারিগরী শিক্ষার আয়ত্বে এনে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের বাইরে গ্রাম নির্ভর বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণের যথার্থ সময়টা এখনই। কারণ ইতোমধ্যে সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী ৬৪টি জেলা ও ৪৬৫টি থানায় যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনায় যে ১২ লক্ষ যুবক ও যুব মহিলাকে আয়-উন্নয়নমূলক-স্বনির্ভর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে তাদের নিজ নিজ এলাকায় যথাযথ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে স্থানীয় জেলা, থানা ও গ্রাম প্রশাসন প্রয়োজনীয় সহযোগিতার উদ্যোগ নিলে স্ব-স্ব এলাকার অন্যান্য অশিক্ষিত বেকার যুবক ও যুব মহিলা, এমনকি তরুণী, তরুণী এবং কর্মঠ বয়োবৃদ্ধরাও কর্মের সুযোগ লাভ করবে। এতে একদিকে যেমন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বনির্ভরতা ফিরে আসবে তেমনি সবুজ এ শ্যামলিমা উন্নয়নের নতুন দিগন্তে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত হবে।
সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

সর্বশেষ ২৪ খবর