ঢাকা ৪ঠা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৪:৫৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৫, ২০১৯
আফতাব চৌধুরী : রসুলুল্লাহ (স.)-র জীবনে হিলফুল ফুজুল বা ‘ফুজুলের প্রতিজ্ঞা’ একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা এতে বিন্দু মাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু এতে তাঁর ভূমিকা নিয়ে যারা যেরকম ইচ্ছে হয়, সে সে-রকম কাহিনী রচনা করে। কেউ কেউ তো এই প্রতিজ্ঞাকে হজরতের মস্তিস্ক প্রসূত একটি যুব সংগঠন রূপে এমনভাবে তুলে ধরেন যে নবিজি হয়ে যার শ্রেষ্ঠ যুব সংগঠক, যেরকম যুব সংগঠন নির্বাচিত হয়ে থাকেন নেহরু যুব কেন্দ্রের মাধ্যমে সরকার কর্তৃক পুরস্কারের জন্য। এসব ঘটে এ কারণে যে, হিলফুল ফুজুলের ইতিহাস সাধারণ মানুষ তথা অতি উৎসাহী শিক্ষিত মহলের মধ্যেও প্রচলিত নয়। এই অজ্ঞাতার দারুণ হুজুরের (স.) প্রশংসা করতে গিয়ে এরা তাঁর সম্পর্কে ভুল তথ্য প্রচারের গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়ে পড়েন নিজেদেরই অজান্তে।
এ প্রসঙ্গে প্রথমেই যে কথা জানা থাকা জরুরি, তা এই যে, মোহাম্মদ (স.)-এর ওই তথাকথিত সংগঠন ও তার প্রতিজ্ঞামাল রচনায় কোনো ভূমিকা ছিল না। এমনকী, তিনি ছাড়া ওই সংগঠন গড়ার কাঝে আর কোনো যুবকও যুক্ত ছিলেন না। যারা ইবনে জুদআন কাইমির ঘরে সমবেত হয়ে প্রতিজ্ঞা রচনা করার পদক্ষেপ প্রগণ করেছিলেন, তাদের সবাই মক্কার প্রবীণ ও বিশিষ্ট নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। ঘটনাচক্রে রসুলুল্লাহ (স.)-ও সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন, তাঁকে আমন্ত্রণ করে নেওয়া হয়েছিল বলে কোনো ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায় না। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তাঁর উপস্থিতি বয়স্কদের উৎসাহিত করেছিল। খুশি হয়েছিলেন তারা তাঁকে তাদের সঙ্গে পেয়ে।
কী ঘটেছিল সেসময়, যা মক্কার এইসব গণ্যমান্য ব্যক্তিকে হিলফুল ফুজুল নামে একটি প্রতিজ্ঞা গ্রহণের জন্য জমায়েত হয়ে এই মহৎ কাজটি করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল? ইবনে আমবি সেহায় গ্রন্থে লিখেছেন যে, অতীতে জুরহুম গোত্রের কয়েকজন লোকমিলে এরকম একটা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন তাদের সবার নাম ছিল ‘ফজল’-ফুজুল ওই ফজল শব্দেরই বহুবচন। হুজুর (স.)-এর কুড়ি বছর সয়মের সময় কোরায়েশ গোত্রের কয়েকটি বংশের মধ্যে সেই প্রতিজ্ঞার অনুরূপে এবং সেই নামের অনেকটি প্রতিজ্ঞা-সংগঠনে একত্রিত হওয়ার ইচ্ছে জাগে; আর তাই ওটা গড়ে তোলা হয়। কিন্তু আসল ব্যাপার তাও নয়। আসল ঘটনা, যা ইবনে কসির হুমাইদির বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন আর ইবনে গিশাম ১ম খন্ড ১৩৩, ১৩৫ পৃঃ, মখুতাসরসিরাত, শেখ আব্দুল্লাহ রচিত পৃঃ ৩০, ৩১-এও‘বর্ণিত হয়েছে, তা এই যে আরবে প্রায়ই যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকে, সেই বিখ্যাত ফুজ্জায়ের যুদ্ধ শুরু হয় এবং তা পাঁচ বছর পর্যন্ত চলে। লড়াইয়ের পর হারাম ঘোষিত যিলকদ মাসে এ জাতীয় লড়াই যাতে আর না হয়, তার জন্য কিছু কোরাইশ তথা বনু হাশিম (রসুলুল্লাহর বংশ), বনু মত্তালের, বনু আসাদ ইবনে কেশাব, বনু-তাইম ইবনে খোররা একত্রিত হয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে জুদঅঅনের ঘরে বসে হিলফুল ফুজুল গঠন করেন। তবে এটাই একমাত্র পটভূমিকা ছিল না হিলফুল ফুজুল গঠনের। ইতো মধ্যে একটি ঘটনা ঘটে যায় মক্কায়Ñবেনু জোবায়রের এক ব্যক্তি কিছু জিনিষপত্র নিয়ে মক্কায় এসেছিল( ইয়েমেন থেকে)। আস ইবনে ওয়ায়েশ তার কাছ থেকে তা খরিদ করে মূল্য পরিশোধ করল না। তখন ওই জিনিষ বিক্রেতা আব্দুদদার মাখজুর, সাহাম এবং আদির নিকট সাহায্যের আবেদন জানায়; কিন্তু কেউই বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিল না। তখন সে ব্যক্তি আবু কুবাইস পাহাড়ের চূড়ায় উঠে কী ঘটেছিল সেসময়, যা মক্কার এইসব গণ্যমান্য ব্যক্তিকে হিলফুল ফুজুল নামে একটি প্রতিজ্ঞা প্রহণের জন্য জামায়েত হয়ে ওই মহৎ কাজটি উদ্বুদ্ধ করেছিল? ইবনে আমিব নেহায়া গ্রন্থে লিখেছেন যে, অতীতে জুরহুম গোত্রের কয়েকজন লোক মিলে এরকম একটা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন তাদের সবার নাম ছিল ‘ফজল’Ñ ফুজুল ওই ফজল শব্দেরই বহুবচন। হুজুর (স.)-এর কুড়ি বছর বয়সের সময় কোরায়েশ গোত্রের কয়েকটি বংশের মধ্যে সেই প্রতিজ্ঞার অনুরূপ এবং সেই নামের আরেকটি প্রতিজ্ঞা-সংগঠনের একত্রিত হওয়ার ইচ্ছে জাগে; আর তাই ওটা গড়ে তোলা হয়। কিন্তু আসল ব্যাপার তার নয়। আসল ঘটনা, যা ইবনে কসির হুমাইদর বরাত দিয়ে বণূনা করেছেন আর ইবনে হিশাম ১ম খ ১৩৩, ১৩৫ পৃঃ’ মখুতাসরসসিরাত, শেখ আব্দুল্লাহ রচিত পৃঃ ৩০, ৩১-এও বর্ণিত হয়েছে, তা এই যে আরবে প্রায়ই যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকে, সেই হিসাবে হুজুরের বয়স যখন ১৫ বছর, তখন বিখ্যাত ফুজ্জায়ের যুদ্ধ শুরু হয় এবং তা পাঁচ বছর পর্যন্ত চলে। লড়াইয়ের পর হারাম ঘোষিত যিলকদ মাসে এ জাতীয় লড়াই যাতে আর না হয়, তার জন্য কিছু একটা করার জন্য কতিপয় গোত্র যেমন কোরাইশ তথা বনু হাশিম (রাসুল্লাহর বংশ), বনু মত্তালেব, বনু আসাদ ইবনে বেশাব, বনু-তাইম ইবনে খোররা একত্রিত হয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে জদুআনের ঘরে বসে হিলফুল ফুজুল গঠন করেন।
উচ্চ কয়েকটি কবিতায় পংক্তি আবৃত্তি করল, যার মধ্যে তার অত্যাচারের কথা বর্ণনা করা হয়েছিল। এতে জোবায়ের ইবনে মত্তালিব চারদিকে ছোটাছুটি করে বলতে লাগলেন যে, এ রােকটির কি কোনো সাহায্যকারী নেই? মোট কথা তারাই চেষ্টায় উল্লেখিত গোত্র সমূহ একত্রিত হল। অতঃপর তারা চুক্তি সম্পাদন করল। আস ইবনে ওযায়লের নিকট থেকে তার খরিদকৃত পণ্যের মূল্যও আদায় করে দিল। -আর রহিকুল মকতুম পৃঃ ৬৭। অনাচারের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে
জোবায়র ইবনে মুত্তালিব,যার উৎসাহ ছিল হিলফুল ফুজুল গঠনের মূলে, একজন কবি ছিলেন। তাঁর কবিতায় আবেগ যুগের ওই নামের সংগঠনটির উল্লেখ আছে। দুটো শে’র এর বঙ্গানুবাদ এ রকমÑ
ফজল বিন দওয়াআ ও ফজল বিন ফুজালা শপথ নিলেন ও প্রতিজ্ঞা করলেন যে মক্কায় আর কোনো জালিম থাকবে না এই সিদ্ধান্তে সবাই একতম হয়ে পাকাপাকি মত দিলেন, তাই মক্কায় আগন্তুক ও প্রতিবেশীদের নিরাপত্তা আছে পূর্ণ মাত্রায়-সিরতে ইবনে হিশাম ও রওজুল আনক পৃঃ ৯১ আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআন ছিলেন হযরত আয়েশা (রাঃ)-র খুড়তুতো ভাই। রসুলুল্লাহ (স.) একদিন বললেন, ওই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আব্দুলাহ বিন জুদআনের বাড়িতে আমিও উপস্থিত ছিলাম। এই প্রতিজ্ঞার বদলে আমাকে যদি লাল উটও দেওয়া হত, তবু আমি তা গ্রহণ করতাম না। আর এখনো যদিএ-ধরনের কোনো প্রতিজ্ঞার জন্য আমাকে ডাকা হয় তাহলে অবশ্যই তাতে অংশগ্রহণ করব। হযরত আয়েশা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন আব্দুল্লাহ কি কেয়ামতের দিন নাজাত (মুক্তি) পাবেন? হুজুর জবাব দিলেন, না। আব্দুল্লা বিন জুদআন দানবীরও ছিলেন। তাঁর খাবার পাক করার জন্য এক বড় একটি ডেকচি ছিল যার ছায়ার গ্রীষ্মকালে দাঁড়ানো যেত।রওজুল আনক পৃৎ ৯২।
কী ছিল মক্কার ওই প্রতিজ্ঞায়Ñবিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নানা কথাই আছে। তবে মওলানা আকরাম খাঁ তাঁর মোস্তাফা-চরিত্রে সে-সবের সার সংকলন এভাবে করেছেন: ) আমরা দেশের অশান্তি দূর করার নিমিত্তে যথাসাধ্য চেষ্টা করব। ) বিদেশি লোকদিগের ধনপ্রাণ ও মানসম্ভ্রম রক্ষার জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব। ) দরিদ্র ও নিঃসহায় লোকদিগের সহায়তা করতে আমরা কখনই কুণ্ঠিত হব না। ) অত্যাচারী ও তার অত্যচারকে দমিত ও ব্যাহত করতে এবং দুর্বল দেশবাসীদিগকে অত্যাচারীর হাত থেকে রক্ষা করতে প্রাণপণ চেষ্টা করব। Ñমোস্তফা-চরিত ২য় সংস্করণ পৃঃ ২৩০।
এখানে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে যে, (স.) যখন হিলফুল ফুজুল দ্বারা এতবেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন যে, নবুওতের যুগেও বলেছেন যে তাঁকে এরকম কোনো শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ডাকলে অবশ্যই তাতে যোগদান করতেন, তাহলে তিনি নিজে এরকম কোনো ব্যবস্থা করেননি কেন? এ প্রশ্নের উত্তর তো এই যে, নবুওতের দায়িত্বর মধ্যেই এই শপথের কাজগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল, তাই আলাদাভাবে নিজে থেকে তেমন কিছু করার উদ্যেগ নেন নি, তবে অন্য কেউ করুক, যার সঙ্গে তাঁরও সহযোগিতা থাকবে এরকম একটা আকাক্সক্ষা পোষণ করেছেন আর প্রকাশ্যে তা বলেছেন।
সাংবাদিক-কলামিস্ট
সম্পাদক : জে.এ কাজল খান
স্বত্ত্ব: দৈনিক বিজয়ের কণ্ঠ (প্রিন্ট ভার্সন)
০১৭১৮৩২৩২৩৯
Design and developed by syltech